ছড়া-কবিতা
জলসাঘর
শংকর চক্রবর্তী
বুলবুলি তো সুর জানে না
হুতোমপ্যাঁচা সুর ফুরোলেই
উড়তে গিয়ে উল্টে যেত
খামখেয়ালির রাগের মতো।
গাছের ওপর হাজার পৃষ্ঠা
পাতায় পাতায় সুরের মজা
বন্ধু পাখি তবলা নিয়ে
রাগের বশে দাদরা বাজায়।
পাখির মেলা বসল যখন
নর্তকী যে গাছে এলো
ডানা ঝাপটে ডিগবাজি খেয়ে
গান না নাচটা দেখায় ভালো।
এবার বুঝি জলসা হবে
গিটার হাতে কাকাতুয়া
পায়রা বসে হাততালি দেয়
সেতার বাজায় সঙ্গী টিয়া।
কুহুধ্বনি বাদ যায়নি
হালকা চালে পেখম মেলে
দূরের বনে পুচ্ছ নাচায়
জমিয়ে দেয় ময়ূররাণী।
ঝিঁঝির মাঝে সুর তুলেছে
সব পাখির তো মধুরকন্ঠ
জোনাকিরা আলোর মেলায়
জলসাঘরে আসর জমায়।
চারপাশে কেউ নেই
শ্যামলকান্তি দাশ
পড়ছে যখন ‘আবোল তাবোল’
‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’ ছড়া,
কে তখন এসে মুখে ঠেসে দিল
গরম তালের বড়া!
ঢুলতে ঢুলতে শুনছে যখন
একটা মজার গান,
কে তখন এসে মলে দিয়ে গেল
বাবিনের দুটো কান!
সে যখন কাল, দেখছিল একা
টিভিতে ক্রিকেট খেলা,
কে তখন খুব চুপিসাড়ে এসে
দিল একখান ঠেলা!
বাবিন যখন হোমটাস্ক ফেলে
টিনটিনে মশগুল,
কে যেন তখন কাঁসিতে বাঁশিতে
বাধাল হুলুস্থুল!
কারা করে এই দুষ্টুমিগুলো,
কারা নাচে ধেই ধেই,
ইস্ কী বিশ্রী বেলা হয়ে গেল—
চারপাশে কেউ নেই!
স্বাধীনতা
কাজী মুরশিদুল আরেফিন
পাখিদের স্বাধীনতা আকাশের বুকে
এইটুকু অধিকার নিয়ে বাঁচে সুখে।
খুশি মত ওড়াউড়ি গাছে ঘরবাড়ি
সুরে সুরে গান গায়, বাধা দিলে আড়ি।
নদীটার ছুটে চলা থামে না তো মোটে
স্বাধীনতা নিয়ে গাছে কত ফুল ফোটে।
বাতাসের গতি কেউ থামাতে কি পারে?
ছয় ঋতু ঘুরেফিরে আসে বারে বারে।
যদি বলি সূর্যের আলো যাক থেমে
আঁধারের ঘনঘটা আসবে কি নেমে?
সকালেই সূর্যটা যাবে কেন ডুবে?
তারও আছে স্বাধীনতা রোজ ওঠে পুবে।
পূর্ণিমা রাতে চাঁদ আলো দেয় ঢেলে
তারারাও স্বাধীনতা রাখে দীপ জ্বেলে।
বৃষ্টির জল ঝরে তার খুশিমতো
ঝর্ণার স্বাধীনতা ঝরে অবিরত।
দিনে রাতে বাঘ কেন করে ডাকাডাকি
আমাদের ইচ্ছেতে থেমে যায় তা কি?
কেউ কারও স্বাধীনতা কেড়ে নিতে এলে
হয়তো বা হয়ে যাবে সব এলেবেলে।
সকলেই স্বাধীনতা চায় দেশে দেশে
আমরাও দেশটাকে গড়ি ভালোবেসে।
শত্রুরা কেউ যদি দিতে চায় হানা
স্বাধীনতা হারাবো না, হেরে যেতে মানা।
পাঁচরকম
আশিসকুমার মুখোপাধ্যায়
এক
ভেবেছি-ভুলের সঙ্গে আড়ি নি
কখনো পেরেছি কখনো পারিনি,
ভুলের নৌকো টলমল করে
তবুও চেষ্টা করতে ছাড়িনি ।
দুই
সুতো দিয়ে জাল বুনেছি তো-নানা
কল্পনা-জাল সুতোয় বোনা না,
ভেজালের জালে পড়ি অহরহ
চকচক করে যা তাই সোনা না।
তিন
বুঝি তো সবাই সবটা জানে না
হালের লাঙ্গল ছাগলে টানে না
পন্ডিত বোঝে ইশারায় সব
মূর্খরা কোনো যুক্তি মানে না।
চার
দেশ মানে শ্রেয়া বলো তো যা-জানো–
সবুজে শ্যামলে মাটিটি সাজানো
পাশাপাশি মঠ-মন্দির-চার্চ
বাউল ফকির, কীর্তন-আজানও।
পাঁচ
জাতপাত নিয়ে, না-বজ্জাতি না
এসো শত ফুলে মালাটি গাঁথি না!
মিলেমিশে থাকি, হাসি-খেলি-গাই
মনে সুর বাঁধি ধাধিনা-নাতিনা…!
মেঘের রাজ্যে
উপাসনা পুরকায়স্থ
লতায়-পাতায় মুক্তোবিন্দু ঝরে
বৃষ্টিতে ভিজে সকাল করছে চান,
জল মেখে গায়ে মাথা নাড়ে ফুলকুঁড়ি
বাজে তানপুরা–আকাশ গাইছে গান!
গুরু গুরু ডাক বিজলি চমক-বাজ
মেঘের রাজ্যে কত কি যে খেলা চলে–
ঝম্ ঝম্ ঝরে জল–বনে জাগে সাড়া
জলসা–তখন গাছেরাও কথা বলে।
মেঘেদের সাথে রোদের রয়েছে আড়ি
কালো মেঘ নাকি ঝগড়ুটে হয় বড়,
গায়েও ভীষণ জোর–তাই রোদ্দুর
মারায় না তারে–ভয়ে থাকে জড়সড়।
পুকুরপাড়ের কদম গাছটা ধ্যানে
নেড়া মাঠে আজ সবুজ গালিচা পাতা–
চাতক ডাকছে ভিজিয়ে নিয়েছে গলা
ঝরঝরঝর–বর্ষা খুলেছে খাতা।
তেরঙ্গা
তুহিন কুমার চন্দ
ছোট ছোট দুটি হাতে
বাগানের ঘাসে
ঝিল মিল দু’বোনেতে
খিলিখিলি হাসে।
হাতে নিয়ে পতাকাটা
বাগানেতে ঘোরে,
তিন রংয়ে দেখি সেটা
বাতাসেতে ওড়ে।
দেশের পতাকা হাতে
ছোট দু’টি মেয়ে,
জয় হিন্দ শব্দেতে
দেখে সেটা চেয়ে।
প্রজাপতি পাখা মেলে
ওড়ে সাথে সাথে,
তিন রঙা পতাকাতে
খুশি নিয়ে মাতে।
দেশের বাড়ি
সুলতা চ্যাটার্জি
হঠাৎ করে পড়ছে মনে, দেশের বাড়ি যাওয়া,
ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং ভ্যান রিক্সার, মাথায় ঠোকর খাওয়া।
এঁটেল মাটির রাস্তা ছিল, জলে কাদায় ভরা,
পায়ের জুতো হাতে নিয়ে, কেবল যুদ্ধ করা।
রাস্তা বেয়ে যাবার পথে, নালাও অনেক আছে,
মাছগুলো সব তিড়িংবিড়িং তার ভেতরে নাচে।
ঘোমটা মাথায় দেওয়া ছিল, কি যে বিরাট কাজ,
থাকতো ঢাকা ঘোমটাতে সব, নিত্যনতুন সাজ।
পৌঁছে বাড়ি শ্বশুর, ভাসুর, নিয়ম মেনে চলা,
তাদের আচার-আচরণে, সকল বলন বলা।
বিদ্যুৎ ছিল না তখন, ছিল হ্যারিক্যান,
পুরোনো দিনের হাঁড়ি-কড়াই, চায়ের সসপ্যান্।
বিকেল বেলায় মশলা মুড়ি জমিয়ে খাওয়া বেশ।
সাঁঝের আকাশ নেমে এলেই সকল আসর শেষ।
রাতের বেলায় ঘুম ভাঙত হুতুম পেঁচার ডাকে,
থেকে থেকে চমকে ওঠা খ্যাকশেয়ালের হাঁকে।
পুরনো দিনের রীতি-রেওয়াজ নেইতো এখন তাই,
সকল স্মৃতি রইল লেখা ডায়েরির পাতায়।
পাঠকদের মন্তব্য
250