এক খুদে ভেড়ির কথা
সেনডিন ড্যাসডিনসুরেন (মঙ্গোলিয়া)
ভাষান্তর : উৎপল ঝা
তেরো বছর বয়সেই আমি ভেড়া চরানো বেশ ভালোভাবেই শিখে গিয়েছিলাম। আমাদের আর আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীদের প্রায় পাঁচশো ভেড়া আমি চরাতে নিয়ে যেতাম এবং ছ’মাস ধরে কী দিন, কী রাত এই ভেড়াগুলোকে নিয়েই আমাকে পড়ে থাকতে হতো চারণক্ষেত্রে। সত্যি বলতে কী, শেষের দিকে আমার আর ধৈর্য থাকত না। ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত নির্জন মাঠে পড়ে থাকতে হতো বলে, কারও সঙ্গে কথা বলারও কোনো সুযোগ থাকত না আমার। শুধু মনে হতো কখন সূর্য ঢলবে আর আমি বাড়িতে ফিরে গরম গরম চায়ের বাটি নিয়ে বসব।
ভেড়াগুলোকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যাওয়ায় আমি প্রতিটি ভেড়ার রকম-সকম ভালোই বুঝতে পেরেছিলাম—কে ঘাসের সঙ্গে এমনকী পোকা-মাকড়ও খেয়ে ফেলে, কে দলের নেতা, কে কে বেছে বেছে সবুজ ঘাস খায় আর কোনটিই বা অলস, নড়তেই চায় না। যদিও লোকে বলে ভেড়ারা খুব শান্ত এবং এরা দলবদ্ধভাবে থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা তা বলে না। যেই না একজন কোনো এক জায়গায় মুখ লাগাতে যাবে, অন্য একজন হামলে পড়ে সেখানেই ঘাস খেতে শুরু করে। ঘোড়াদের মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব, ভেড়াদের মধ্যে তেমনটা দেখা যায় না! ঘোড়ারা চালাক বলে সহজেই যেমন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নেয়, তেমন নিজেদের মধ্যেও গভীর সখ্য। ঘোড়ারা বন্ধু, পরিচিতজন, এমনকী শত্রুদের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। ভেড়াদের মধ্যে কিন্তু তা নেই। খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো বিবেচক-ভেড়া খুঁজে পাওয়া যাবে।
আমাদের বছর তো শুরু হয় চান্দ্র-মাস অনুযায়ী।
তা আমার এক কাকু নতুন বছরে আমাকে ছোট কানওয়ালা একটা ছোট্ট ভেড়া উপহার দিয়েছিল। ভেড়া নয় ভেড়ি। তা সে ভেড়ির সঙ্গে আমার ভালো বোঝাপড়া গড়ে উঠেছিল। সে ছিল বেশ বুদ্ধিমতী। আমি ডাকলেই সে যেখানেই থাকুক না কেন ঠিক আমার কাছেই ছুটে আসত। এরপর যা হলো, আমি না ডাকলেও সে আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করত। আর আমি যেখানেই যেতাম সে আমার পিছু পিছু ছুটত। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা আমার পকেটে যে খাবার ভরে দিতেন, আমি সেই ক্ষুদেকেও তার থেকে ভাগ দিতাম। সে আবার মিষ্টির খুব ভক্ত। গোরুরা মিষ্টি পছন্দ না করলেও, ভেড়ারা কিন্তু মিষ্টি ভালবাসে। আমি একটুকরো ক্যান্ডি দিলে, সে আমার পেছনে পেছনে ঘুরত আরও একটু ক্যান্ডির আশায়।
এক হেমন্তকালে নতুন চারণক্ষেত্রে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। আমি আমার খয়েরি রঙের ছোট্ট ঘোড়ায় চড়ে ভেড়ার পাল নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে রওনা দিলাম। সন্ধের আগেই নতুন চারণক্ষেত্রে পৌঁছাতে হবে। হেমন্তকাল, তাই ভেড়ার পালকে দ্রুত ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়া মুশকিল। কারণ, ভেড়াগুলি এইসময় বেশ মুটিয়ে থাকে।
আমার সেই ক্ষুদে-ভেড়ি আমার কাছে ছুটতে ছুটতে আসে। আমি তাকে এক টুকরো মিছরি দিয়ে আমাদের অস্থায়ী গোলাকার ঘরের সন্ধানে এগিয়ে যেতে যেতে অবশেষে নতুন চারণক্ষেত্রে পৌঁছাই। জায়গাটা সম্বন্ধে আমার প্রাথমিক ধারণা থাকায় সহজেই সেখানে পৌঁছে গেলাম। দেখি সবুজ ঘন বড়ো বড়ো ঘাসের গুচ্ছ বাতাসে দুলছে। রোদের তাপে একটু হলদে হয়ে গেলেও আগের চারণক্ষেতের চেয়ে এটিতে অনেক বেশি ঘাস। চারদিকের ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঢিবি সবুজ ঘাসে ভরা। এই ঘাসে ভরা জমির কয়েক কিলোমিটার দূরেই শুরু হয়েছে গোবি মরুভূমির লোনা জমি, যা ছোটোছোটো কাঁটা গাছে ভর্তি। আর আছে হালকা হলুদ রঙের এক ধরনের লতা। এই তেতো-নোনা গুল্ম ও লতা পশুদের খুব প্রিয়। হলুদ ক্ষেত আর নোনা-বিলের লালচে-বাদামী গুল্ম দারুণ এক রং-বাহার মেলে দিয়েছে।
ভেড়ার পালকে তাড়িয়ে আমাদের ঠেকের কাছে পৌঁছাতেই ভেড়ার পাল কোনোদিকে না তাকিয়ে প্রাণভরে সবুজ ঘাস খেতে শুরু করে। আমি ঘোড়া থেকে নেমে তাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে চারিদিক চেয়ে দেখি। দেখি ঢলে পড়া সূর্যের নিচের দিকে দিগন্ত জুড়ে ঘন কালো মেঘ ঘনিয়েছে। মনে মনে বলি—কাল নিশ্চয়ই ভারী বৃষ্টি হবে । এরপর সেই গোলাকৃতি ঘরে ঢুকে আমার মা, বাবা, আমি কেবল চা নিয়ে বসেছি। এমন সময় একটা চিৎকার শুনতে পাই, ‘আগুন, ‘আগুন’—চিৎকারটা ছিল ঘোড়ার সহিস অডির।
আমি, মা এবং বাবা ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে আসি। দেখি পশ্চিম আকাশের মেঘ লাল সূর্যকে ঢেকে ফেলেছে। আর পশ্চিম দিক থেকে ঘন-কালো ধোঁয়া ভেসে আসছে।
অডি বলে ওঠে, ওই উঁচু ঢিবি থেকে দেখলাম ওইদিক থেকে আগুন ছুটে আসছে। এদিকেই আসছে, তাকে খুব উদবিগ্ন দেখায়।
বাবা আর অডি তাড়াতাড়ি কিছু ফেল্ট মানে ঝলসানো চামড়ার তৈরি হলদে কাপড় লম্বা লাঠির ডগায় বেঁধে জলে ভিজিয়ে সামনের দিকে ছুটল। আর মা গাড়ির সঙ্গে একটি বলদ জুতে—তাতে একটা জল ভর্তি বড়ো ড্রাম তুলে তাদের পেছনে পেছনে রওনা দিল। আসলে ওই ফেল্টগুলি আগুনের তাতে শুকিয়ে এলে ওই ড্রামের জলে তা ভিজিয়ে নেওয়া হবে। যাওয়ার সময় মা কেন যেন বলল “ভেড়াদের দিকে লক্ষ রাখিস।”
ভেড়াগুলি তো নিশ্চিন্তে মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে। তাদের আবার দেখার কী আছে ! কিন্তু আগুন যদি আমাদের এই অস্থায়ী আবাসের দিকে ধেয়ে আসে, আমি একা কী করে ভেড়াগুলির দিকে নজর রাখব?
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি বাবা-মা-অডি কী করে। যেহেতু ওইদিকে ঘাস কম এবং বাতাসের বেগ এখনও ততটা নয় আশা করা যায় ওরা তাড়াতাড়িই ওই ভেজা কাপড় দিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলতে পারবে। আমার সেই সময় আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছিল—গত বছর বসন্তকালে আমি আমার দুই বন্ধুর সঙ্গে ঢালু মাঠে খেলছিলাম। আমরা সেখানে এমনিই খেলাচ্ছলে আগুন জ্বালিয়ে ছিলাম কিন্তু হঠাৎই তা শুকনো ঘাসে ছড়িয়ে পড়ে। ভাগ্য ভালো বাতাসের জোর ছিল না। আমরা আমাদের মাথায় ফারের মানে ওই লোমশ চামড়ার টুপি দিয়েই আগুন নিভিয়ে ফেলতে পেরেছিলাম। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা যেন অন্যরকম। কারণ, এবার বাতাসের বেগ যেমন বেশি, তেমনি ঘন শুকনো ঘাসের পরিমাণও বেশি।
আমার হঠাৎই মনে হল, এইসব ভাববার সময় এখন নয়। আমাকেও কিছু একটা করতে হবে। দেখি অডির বুড়ি-মা তার ঘরের সামনের শুকনো ঘাস চেঁছে ফেলেছে এবং আমাদের ঘরের সামনের ঘাস ওপড়াতে লেগেছে।
আমাদের বেশ কয়েকটি কাঠের ভাঁজ করা খাঁচা বা খোয়াড় আছে, যাতে ভেড়াদের ভরে রাখা যায়। কিন্তু সেগুলি এখনও দু’চাকার গাড়িতেই রয়ে গেছে, নিচে নামানো হয়নি। অডির মা বলল, ওই খাঁচাগুলো নামাতে পারলে কাজে আসবে। কারণ, ওই খাঁচাগুলোয় ভেড়াগুলোকে ভরে দিতে পারলে আগুন ওদের ছুঁতে পারবে না। তাই আমি গাড়ি থেকে খাঁচাগুলো নামানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা করেও আমি সেই খাঁচাগুলো নামাতে পারছিলাম না আর সেই লেলিহান আগুন আমাদের দিকে তেড়ে আসছিল। পশ্চিমদিকের ঢিবি থেকে পোড়া ঘাসের ছাই উড়ে আসছে। আর সেই কালো ধোঁয়া আর আগুনের মধ্যেই আমি বেশ কয়েকটি ঘোড়াকে প্রাণভয়ে ছুটে যেতে দেখলাম। কাদের ঘোড়া কে জানে। আরও দূরে আমি দেখলাম কয়েকটি ছুটন্ত হরিণ আর হায়নাকে। আগুনের ভয়ে হরিণ আর তার শত্রু হায়নারা একসঙ্গে একদিকেই ছুটছে। আগুন আর ধোঁয়া দেখে এবার আমাদের ভেড়াগুলি ভয় পেল। আমি আমার সেই ছোট্ট ঘোড়ায় চেপে ভেড়াগুলির দিকে ছুটলাম তাদের এক জায়গায় জড়ো করার জন্য।
লোকে বলে ছোটো-বড়ো হরিণেরা আগুনের ভয়ে ছুটতে গিয়ে দিশাহারা হয়ে দৌড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে। যদিও হরিণ খুব দ্রুতগামী, কিন্তু, তারা সহজেই হাঁপিয়ে পড়ে, ফলে আগুন তাদের ঘিরে ফেলে এবং পুড়িয়ে মারে। আর সেই ছুটন্ত হরিণের আগুনের গোলা পিছন থেকে ছুটে আসা অন্য হরিণদেরও ঝলসে দেয়।
বয়স্ক মানুষেরা বলেন, আগুনের থেকে দূরে ছুটবার চেষ্টা না করে, যে জায়গায় ঘাস ইতিমধ্যে ঝলছে গেছে বা পুড়ে গেছে, সাবধানে তার দিকে এগুলে বরং বাঁচা যেতে পারে। ছাইয়ের উপর দাঁড়ালে সেখানে আর প্রাণের ভয় থাকে না।
তাই আমি ঠিক করলাম আমাকে যা করতে হবে, তা হলো ভেড়াগুলোকে পোড়া জায়গায় নিয়ে গিয়ে জড়ো করা। পশ্চিমদিকের জায়গা পুড়িয়ে আগুন পুবের দিকে আসছে। পুরো জায়গাটা আগুনের লাল শিখা আর কালো ধোঁয়ায় ভরে গেছে।
অবস্থাটা খুবই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক। তবু আমি বুঝলাম সাহস হারালে চলবে না এবং যে কোনোভাবেই হোক আমাদের ভেড়াগুলোকে বাঁচাতে হবে। মা তো বলেই গেছে এদের দেখার জন্য। আমাকে যেভাবেই হোক তাদের আগুন থেকে দূরে নিয়ে যেতে হবে। বাতাসের বেগ যা, তাতে আগুন খুব দ্রুতই পার হয়ে যাবে। আমি যদি একটা জায়গায় ভেড়াগুলোকে জড়ো করতে পারি, তাহলে হয়তো তাদের বাঁচানো যাবে।
আগুন আমাদের ঘরের দিকে ছুটে আসছে, ভাবলাম অডির মাকে জিজ্ঞেস করব, কী করা যায়। চেয়ে দেখি সে তার কুকুরকে নিয়ে লোহার চাকাওয়ালা গাড়ির ওপরে খাঁচার মধ্যে দাঁড়িয়ে। তার মানে আমাকেই যা কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রথমেই আমার সেই ক্ষুদে ভেড়ির কথা মনে হলো। ভাবলাম ওই ক্ষুদেটিকে অডির মায়ের হাতে তুলে দেব। কিন্তু সে সময়ও নেই। আগুন আমাদের ঘরের সামনের ফাঁকা জায়গা, গাড়ি পার হয়ে গেল। যত দ্রুত আগুন পার হয়ে গেল তাতে আশা জাগল হয়তো ভেড়াগুলোর লোমে আগুন লাগা থেকে রক্ষা করা যাবে। শুধু ভেড়াগুলোকে একটা ছোট্ট জায়গায় জড়ো করে রাখতে হবে। কিন্তু সেটাই প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।
আগুন আসছে দেখে ভেড়াগুলো প্রাণভয়ে ছুটতে শুরু করেছে। আমি আমার ঘোড়া ছুটিয়ে ভেড়াগুলোর আগে পৌঁছে গেলাম। আর মজার ব্যাপার হলো, আমার যে ঘোড়া মোটেই ছুটতে চায় না, সে আজ আগুনের ভয়ে তেজি ঘোড়া হয়ে উঠেছে। বুঝলাম সে ব্যাটা ইচ্ছে করে অলস সেজে থাকে। আমার ইশারা বুঝে সে জোরে ছুটতে থাকে এবং আমিও ভেড়াগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে ফেলি।
কিন্তু তাতে খুব একটা সুবিধা হলো না। যদিও ভেড়াগুলিকে একটা জায়গায় জড়ো করা হয়েছে, কিন্তু, আগুনের শিখা শুকনো ঘাসে জ্বলতে শুরু করেছে। আর সেই আগুনের ঘেরায় ভেড়াগুলো ছটফট করছে। আমি প্রাণপণ চিৎকার করে ঘোড়া ছুটিয়ে ভেড়াগুলিকে আগুনের গতিপথের উল্টোদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম। আর এত চেষ্টা করেও মাত্র একশো মতো ভেড়াকে আগুনের থাবা থেকে বাঁচানো গেল। আগুন দ্রুত পার হয়ে গেল আর আমি একশো মতো ভেড়াকে নিয়ে পোড়া ছাইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলাম। আগুনের তাত লাগলেও আমরা প্রাণে বেঁচে গেলাম। বেশিরভাগ ভেড়া সামনে ছুটতে গিয়ে আগুনের গোলার মধ্যে পড়েছে। বেঁচে যাওয়া ভেড়াগুলিকে রেখে আমি আগুনের পিছু পিছু ঘোড়া ছোটালাম।
এগুতে গিয়ে দেখি অনেক ভেড়া আগুনে পুড়ে পোড়া কয়লার মতো পড়ে আছে। আসলে আগুন প্রথমে লাগে ভেড়াদের পায়ে–ফলে পায়ের পেশি পুড়ে যাওয়ায় ভেড়ারা কাটা গাছের মতো উল্টে পড়ে। যত এগুতে থাকি ততই আগুনে ঝালসানো ভেড়া চোখে পড়ে। হঠাৎ মাথায় এই সময় একটা ভাবনা খেলে যায়–এখনো যে সব ভেড়াকে আগুন ছুঁতে পারেনি তাদের যদি তাড়িয়ে লাল গুল্মে ভরা নোনা নিচু জায়গায় নিয়ে যেতে পারি–তাহলে হয়তো তারা বেঁচে যেতে পারে। কারণ, ওই লাল গুল্মগুলোয় সহজে আগুন লাগে না।
আমি আগুনের পাশ ঘেঁষে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলাম। সামনে তখনও বেশ কিছু ভেড়া ছুটছে, তাদের আরও তাড়া দিয়ে আমি এগুতেই দেখতে পাই সেই লাল আগাছায় ভরা এক ক্ষেত। কিন্তু সেই আগাছাগুলো শুকনো এবং বেশ লম্বা। এগুলোয় সহজেই আগুন লেগে যাবে। তাই আমাকে ভেড়াগুলিকে দ্রুত তাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে ওই শুকনো আগাছায় আগুন লাগার আগেই ভেড়াগুলিকে সেখান থেকে বের করে নেওয়া যায়। কিন্তু আগাছার ঘন ঝোপের জন্য ভেড়ারা সেগুলি ভেদ করে যেতে না পারায় সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
আমি ঘোড়া নিয়ে কোনোভাবে সেই আগাছা ডিঙিয়ে শুকনো নোনা জায়গায় পৌছালাম। বুঝলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই ভেড়াগুলি ওই আগাছার জঙ্গলেই পুড়ে মরবে। তাদের বাঁচানোর কোনই উপায় নেই। সেই শুকনো আগাছায় আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকল—প্রায় দু’মিনিট উঁচু আগুনের শিখা দেখা দিল। বুঝলাম সব ভেড়াই শেষ হয়ে গেল।
হঠাৎ মনে হলো, আমার ক্ষুদে-ভেড়াটার কী হলো ? আমি প্রাণপণ শক্তিতে চিৎকার করতে থাকলাম—আমার প্রিয় ক্ষুদে সঙ্গী, তুমি কোথায়? এদিকে চলে এসো—
তারপরই দেখলাম আমার সেই ক্ষুদে সঙ্গী আগাছা থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো। দেখে স্বস্তি পেলাম, আগুন তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।
আমি ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে তাকে কোলে তুলে নিলাম। সে তার সুন্দর ছোট্ট জিভ বের করে আমার হাত চাটতে লাগল। বুঝলাম সে, মিছরি বা মিষ্টি চাইছে। যেন কিছুই কোথাও ঘটেনি, সবকিছু ঠিকই আছে। আমার চিৎকার শুনে তার মনে হয়েছে, অন্যান্য দিনের মতোই তাকে মিছরির টুকরো দেওয়ার জন্যই ডাকছি। আর সেই মিষ্টির লোভই ওকে বাঁচিয়ে দিলো।
এবার সেই ক্ষুদে ভেড়ির পিছু পিছু গোটা দশেক ভেড়া কোনোভাবে সেই আগাছার জঙ্গল থেকে বের হয়ে এলো। তোমরা তো জানোই ভেড়াদের একটা স্বভাব হচ্ছে, তারা সামনে কাউকে দেখলে তার পিছু নেওয়ার চেষ্টা করে, তাই ক্ষুদে ভেড়ির কাছাকাছি যারা ছিল তারা কোনোক্রমে বের হয়ে এসেছে। কিন্তু অন্য সকলকেই আগুন গিলে ফেলেছে। শুকনো আগাছাগুলির আগুন নোনা জমির কাছে পৌঁছেই থমকে গেল। আর আমি সেই ক্ষুদে ভেড়ি এবং দশটি মতো ভেড়াসহ বেঁচে গেলাম।
সন্ধের মুখে আমি আমাদের সেই অস্থায়ী ঘরে ফিরে এলাম। আমার মা-বাবা আমি বেঁচে আছি দেখে খুশি। কিন্তু আমার মন ভারাক্রান্ত। বারবার মনে পড়ছিল মায়ের কথাটি—ভেড়াগুলোকে দেখিস। আমি তো তাদের সকলকে বাঁচাতে পারিনি।
যে একশোটি ভেড়াকে আগে রক্ষা করেছিলাম তারা ইতিমধ্যে ঘরের কাছে এসে জড়ো হয়েছে। আমি আমার সেই ক্ষুদে ভেড়ি এবং বাকি দশটি ভেড়াকেও তাদের মধ্যে ছেড়ে দিলাম। ঘোড়াগুলি সেই নোনা-নিচু জমিতে আশ্রয় নেওয়ায় বেঁচে গেছে। আমাদের প্রতিবেশী তাভগাইয়ের ভেড়াগুলি বেঁচে গেছে। কারণ, তারা তাদের ভেড়াগুলিকে লোহার খাঁচার মধ্যে ভরে দিতে পেরেছিল। এই ঘটনা থেকে আমার কিছু শিক্ষা হলো—প্রথমত, আগুন থেকে বাঁচতে হলে আগুনের সামনে না ছুটে, পেছনের পোড়া-জমিতে আশ্রয় নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, যখন তা সম্ভব হবে না, তখন পশুদের লোহার চাকাওয়ালা খাঁচায় ভরে দিতে হবে। আর খাঁচার চারদিকের ঘাস চেঁছে দিতে হবে—জ্বলবার মতো ঘাস যেন সেখানে না থাকে।
যাই হোক, পরদিন আমরা সবাই সেই পোড়া ক্ষেত ছেড়ে নতুন জায়গার খোঁজে রওনা দিলাম, যেখানে পশুদের খাওয়ার মতো সবুজ ঘাস রয়েছে।
এরপর বহুকাল কেটে গেছে, আমি গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে এসেছি। তারও বেশ কিছুকাল পরে আমি গ্রামের বাড়িতে ফিরে ক্ষুদে কানওয়ালা নতুন একপাল ভেড়া দেখে চমকে উঠলাম। আর মন খুশিতেও ভরে উঠল—বুঝলাম এরা সবাই আমার সেই মিষ্টিপ্রেমী ছোটো কানওয়ালা ভেড়ির বংশধর।
আরও বুঝলাম, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মূল্য কতখানি। অনেক মূল্য দিয়েই তা অর্জন করতে হয়। সেই ছোটো ছোটো কানওয়ালা ভেড়ির ছবি আমার মনের কোণে আজও আঁকা রয়ে গেছে।
পাঠকদের মন্তব্য
250