ছোটোদের চাঁদের হাসি / দেশ-বিদেশের গপ্পো / জুলাই ২০২৬

উড়ন্ত চেরিগাছ

জাপানি রূপকথা

ভাষান্তর : পবিত্র সরকার

 

জাপানিদের মধ্যে ‘সামুরাই’ যারা ছিল, তারা ছিল ভয়ঙ্কর বীর। বীরত্বের জন্যে তারা করতে পারত না, এমন জিনিস নেই। অন্যের মাথা থেকে নিজের মাথা কিছুই কাটতে তাদের কোনো অসুবিধা হতো না। তেমনই এক পাগলা সামুরাইয়ের গল্প আজ তোমাদের শোনাবো।

 

      ইনামুরায়া তেকেৎসুরা ছিলেন এক বিখ্যাত সামুরাই, মানে বীর যোদ্ধা আর রাজপুরুষ। একদিন তিনি তাঁর মাদুরের বিছানায় (জাপানিরা তাই ঘুমায়) গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আর তাঁর নাক ভীষণ শব্দ করে ডাকছে। তা বীর আর রাজারাজড়াদের ঘুমালে নাক ডাকবে না, এমন কী হয়? তাঁর মাদুরের পাশেই বসে আছে তাঁর সহচর অর্থাৎ চাকর সেইকি। প্রভু ঘুমোচ্ছেন, তাই তাকে জেগে থাকতেই হবে। কেন? না, তাকে দু’হাত জোড় ক’রে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করতে হবে, যেন তাঁর প্রভুর ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্নের দৈত্যরা এসে ঝামেলা না করে।

 

    সে বসে বসে মালা জপ করছে। কিন্তু বেচারার নিজেরও ভয়ঙ্কর ঘুম পাচ্ছে। হুমহাম করে হাই উঠছে খুব। সে ভাবছে, কোন কাজটা ভালো হবে? জেগে বসে প্রভুর ওই মোষের মতো নাকের ডাক শোনা, না একটু ঘুমিয়ে নেওয়া? শেষে মনে হলো ঘুমিয়ে নেওয়াই বেশ মজার আর বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তাই সে পাশের মাদুরে নিজের হাতের ওপর মাথা রেখে, মালা জপায় ক্ষান্ত দিয়ে, বেঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল। তারও নাক ডাকতে শুরু করল কি না, বলতে পারব না। মোট কথা, দু’জনেই ঘুমোচ্ছে।

 

       কান্ডটা ঘটল এরপরই। ব্যাপারটা হয়েছে কি, সামুরাই মশাইয়ের দেয়ালে একটা ছবি ছিল। সেটা বরফে-ঢাকা ফুজিয়ামা পর্বতচুড়োর ছবি, তার পাশে একটা ঘুরন্ত পাখাওয়ালা গম-ভাঙানোর মিল, আবার অন্যদিকে কিছু সারসপাখির দল উড়ে যাচ্ছে। ওই ছবির পেছনে লুকিয়ে ছিল আর কেউ নয়, সেই দুঃস্বপ্নের দৈত্য। সে এবার ছবির পেছন থেকে গুটিগুটি বেরিয়ে এলো। সে দেখল যে প্রভু আর ভৃত্য দু’জনেই ঝড়ের মতো নাক ডাকাচ্ছে, সে আওয়াজ যেন ওই গম ভাঙানোর হাওয়াকলের আওয়াজকে আর সারসগুলোর ক্যাঁকানিকেও হার মানাচ্ছে। দেখে হাসিতে তার বত্রিশখানা দাঁত বেরিয়ে পড়ল। সে দু’জনের ওপরেই নেমে এসে বসল। প্রথমে সে সেইকির জপের মালা লুকিয়ে ফেলল। তারপর ঘরের মধ্যে এদিক-ওদিক হাঁটল একটু। একপাশে জলভরা বালতি ছিল একটা, সে সেদিকে তাকাতেই সেটা কোলাব্যাঙ আর ব্যাঙাচিতে ভর্তি হয়ে গেল।

 

       এরপর দুঃস্বপ্নের দৈত্য তার লোমওয়ালা ল্যাজের ডগাটা সামুরাই মশাইয়ের নাকের ডগায় বুলোতে বুলোতে বলতে লাগল, হা হা! আর জন্মে সামুরাই মশাই নিশ্চয়ই প্রচুর ঢাকঢোল খেয়ে পেট ভরেছিলেন, তাই তাঁর পেট থেকে এমন আওয়াজ বেরোচ্ছে! হতেও পারে যে তাঁর নাকের ফুটোতে সেই টাইফুনটা (সমুদ্রের ঝড়) লুকিয়ে আছে এই সেদিন যে ঝড়টা একটা পুরো দ্বীপকে আকাশে একশো কিলোমিটার উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আহা, ঘুমোন, সামুরাইদাদা, ঘুমোন। আমি আমার ল্যাজের ডগা থেকে একটু ধুলো ঝেড়ে দিই আপনার নাকে। তখন আপনি যে সব খারাপ স্বপ্ন দেখবেন, বাপরে, নেড়িকুত্তারাও অত খারাপ স্বপ্ন দেখে না!—বলে সে সামুরাইয়ের নাকে ল্যাজটা ঝেড়ে হুশ করে উড়ে পালাল। যাবার সময় তার ধাক্কায় দেয়ালের ফুজিয়ামার ছবিটা কাত হয়ে ঝুলতে লাগল।

 

        এখন সহচর সেইকি ঘুমোবার আগে ইনামুরায়া মশাই খুব চমৎকার একটা স্বপ্ন দেখছিলেন। দেখছিলেন যে, তিনি এর মধ্যে পীত (হলুদ) সাগর পার হয়ে চিনদেশ দখল করছেন, তারপর একটা বিশাল জাহাজ বানিয়ে তার ওপরে ওদেশের রাজধানী পুরো পিকিং শহরটাকে ঘরবাড়িশুদ্ধ তুলে নিয়ে নিজের দেশ জাপানের দিকে রওনা দিয়েছেন। সমুদ্রযাত্রা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, তখন তাঁর ইচ্ছে হলো যে, কতজন চিনাকে বন্দি করে এনেছি, তা একবার গুনে দেখি। ওই চিনা বন্দিরা তাদের মাথার বিনুনি দিয়ে একজনের সঙ্গে আর-একজন বাঁধা ছিল, আর তাদের পা ঢোকানো ছিল একটা গর্ত-করা কাঠের লম্বা কড়ির সঙ্গে। তারা ঢেউয়ের তালে তালে পা বাজাচ্ছিল, তাতে বেশ একটা গানের তাল তৈরি হচ্ছিল।

 

       ইনামুরায়া সাঁইত্রিশ লক্ষ একশো এগারো জন বন্দিকে গোনা শেষ করেছেন–এমন সময় তাঁর হিসেব কেমন গোলমাল হয়ে গেল। মনে হলো, তাঁর নাকে কী-একটা যেন প্রবল সুড়সুড়ি দিচ্ছে, আর তাঁর বেদম হাঁচি পেল। সে এক মহা সংকট। তিনি জানতেন যে সেই সময় একবার যদি তিনি হেঁচে ওঠেন তবে মুহূর্তে পুরো জাহাজটা চুরমার হয়ে যাবে। আর বন্দি-টন্দিশুদ্ধ তিনি সমুদ্রে তলিয়ে যাবেন। তাই গোনাগুনতি থামিয়ে তিনি জাহাজের ডেকে দৌড়লেন।

 

         ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর দুঃস্বপ্নটা শুরু হলো। চিনা বন্দিরা দারুণ বেগে মাথা ঝাঁকাতে শুরু করল, ফলে তাদের বিনুনি খুলে গেল। আর পায়ের লাথিতে পাগুলো খুলে গেল কাঠের গর্ত থেকে। তখন তারা একসঙ্গে ইনামুরায়ার পেছনে দৌড়োল। আর তিনি যেই সিঁড়ি থেকে ডেকে পা দিতে যাবেন, তখন তাঁকে ধরে পেড়ে ফেলল তারা। তারপর তাঁর জামাকাপড় টেনে খুলে নিয়ে তাঁকে যে বিচ্ছিরি অপমান আর লজ্জায় ফেলল, তা বলবার নয়।

 

         সামুরাই মশাই আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি এমন জোরে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলেন আর সেই সঙ্গে এমন একটা হাঁচি দিলেন যে তার ধাক্কায় পুরো জাহাজটা দু’টুকরো হয়ে গেল। একটা বিশাল জলস্তম্ভ জেগে উঠল সমুদ্রে, আর তাঁকে তার চুড়োয় নিয়ে একেবারে জাপানে তাঁর নিজের ঘরের মধ্যে এনে ফেলল। এবার মেঝেতে মাদুরের ওপর উঠে বসলেন তিনি। কিন্তু তাঁর হাঁচি আর থামেনা, ‘হ্যাঁচহ্যাঁচ-ছো!’  করে হেঁচেই যাচ্ছেন তো হেঁচেই যাচ্ছেন। আর তাঁর উলটো দিকে তাঁর সহচর সেইকিরও একেবারে হুবহু এক অবস্থা। সেও এমন হাঁচছে যে তাঁর মাথা প্রায় ছাদে গিয়ে ঠেকে আর কী! দুঃস্বপ্ন-দৈত্যের ল্যাজের ডগার ধুলোর কিছু অংশ নিশ্চয়ই তার নাকেও পৌঁছেছিল।

 

       দু’জনেই পাগলের মতো হেঁচে যাচ্ছে, হাঁচতে হাঁচতে প্রায় একে অন্যের ওপর এসে পড়ে আর কী! শেষে একটা ভীষণ জোর হাঁচির তোড়ে তাদের দুজনের মাথা ঠুকে গেল। ‘উহ!’ বলে সামুরাই মশাই চেঁচিয়ে উঠলেন, অভিশাপের মতো করে বললেন “চিনারা জাহান্নামে যাক! বাপরে! কী ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন!” তারপর কাঠের জলভর্তি বালতির দিকে ছুটে গেলেন চোখেমুখে জল দেবেন বলে। গিয়ে দেখেন, তাতে কালো কোলাব্যাঙ আর ব্যাঙাচি গিজগিজ  করছে। দারুণ রেগে গিয়ে তার ওপরে মারলেন তলোয়ারের এক কোপ। বালতি দু’খান হয়ে জল ছড়িয়ে গেল ঘরময়। ব্যাঙগুলো লাফিয়ে দরজা দিয়ে পালাল, আর ব্যাঙাচিগুলো জল হয়ে জলে মিশে গেল। এই গেল এক দুঃস্বপ্ন।

 

        ইনামুরায়া রাগে ফুঁসতে লাগলেন। প্রথমত, একটা ভালো স্বপ্নের বারোটা বেজেছে। তার ওপর একটা খারাপ স্বপ্ন তাঁকে দেখতে হলো। যুদ্ধফুদ্ধের কথা এখন তাঁর মনে পড়ছে না। কিন্তু তিনি যে বিশাল চিন সাম্রাজ্য জয় করেছিলেন, আর পুরো পিকিং শহরটাকে জাহাজে তুলে নিয়ে আসছিলেন–এটা তো ঠিক। জানলা দিয়ে যেমন ভোমরা বেরিয়ে যায় তেমনি সেই সুখের স্বপ্নটাও তাঁর মাথা থেকে ভেগেছে। ভয়ংকর রেগে গেলেন তিনি।

 

          “এবার তো কারও একটা মাথা আমাকে নামাতেই হবে, নইলে আমার নিজের তলোয়ার গিলে খাব আমি!”–রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন তিনি। “সত্যি বলতে কী, যে এই ঘরে প্রথম ঢুকবে, তারই মাথাটা কেটে ফেলব আমি! এই আমার শপথ। হ্যাঁ।” সামুরাইয়ের শপথ বলে কথা, সে তো রাখতেই হবে ! কিন্তু বাবার কথা শেষ হতে না হতেই সামুরাইয়ের ফুলের মত সুন্দরী মেয়ে ও-তাই ঘরে ঢুকে পড়ল। কী ফুল? না, গোলাপ নয়, কার্নেশন নয়, রজনীগন্ধা নয়, ক্রিসান্থিমাম নয়। লোকে বলত সে ছিল চেরিফুলের মত সুন্দরী। মেয়েটি তার মধুর উদ্বেগের গলায় বাবাকে বলল, “বাবা, তোমাকে কেউ ঘুমের সময় বিরক্ত করেছে কি? তোমার চ্যাঁচানিতে বাড়িসুদ্ধ লোক তো জেগে উঠেছে।”

     “ওরে কী সর্বনাশ! তুই হতভাগী কেন মরতে এলি এ  সময়? জানিস, এই প্রশ্নের জন্যে তোকে কী দাম দিতে হবে?”–ইনামুরায়া চেঁচিয়ে উঠলেন।

       ও-তাই বাবার কথা কিছু না বুঝে বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাঁর দিকে তাকাল। বাবা তখন তাঁর তলোয়ারে থুথু লাগিয়ে তা হাত দিয়ে মুছে বললেন,“আমি তোর মাথা কেটে ফেলব! এই মাত্র আমি সেই প্রতিজ্ঞা করেছি!”

       “ও মা সে কী কথা! তুমি আমার মাথা কাটলে, আমি বাগানের গাছে পাখিদের গান শুনব কী করে ? আমার কিমোনোর ওপরে সোনালি ডানার প্রজাপতিরা এসে বসবে, তা দেখব কেমন করে ? তোমার গালে চুমো খেয়ে আদর করব কী করে, বাবা?”–ও-তাই বলল।

    ইনামুরায়া বলে ওঠে “আমি তার কী জানি? আমি তো প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছি মা। এর আর নড়চড় হবে না।”

        

    ও-তাই তবু করুণ সুরে মিনতি করতে লাগল–“বাবা, ও বাবা, আমি তো বাগানে একটা নতুন চেরিগাছ পুতেছি। সেটা বড়ো হচ্ছে। মায়ের মতো ওটাকে আমি ভালোবাসি, বাবা! আমি পাশের খাল থেকে জল নিয়ে এসে সন্ধ্যাবেলায় খালি ডালগুলোতে দড়ি বেঁধে শক্ত করে শীতকালে ওর শিকড়ে যাতে বরফ না লাগে সেজন্যে মাদুর দিয়ে ঢেকে দিই। দ্যাখো তো এখন গাছটা কী সুন্দর হয়েছে। গোলাপী ফুলে ছেয়ে গেছে!”

    ও-তাই জানলা দিয়ে চেরিগাছটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওগো চেরিগাছ, আমাকে বাঁচাও তুমি !”

 

     ইনামুরায়া সে সব কথায় কান না দিয়ে ও-তাইয়ের মাথা কাটবার জন্যে তরোয়াল তুললেন। তখনই একটা কান্ড ঘটল। চেরিগাছটা হঠাৎ জানলা দিয়ে তার ডালপালা বাড়িয়ে ও-তাইকে জড়িয়ে তুলে নিল। তারপর নিজে শিকড় উপড়ে ইনামুরায়ার মাথায় একগাদা নরম মাটি ফেলে উড়ে গেল, ছাদ পেরিয়ে, আকাশে।

         “থাম থাম”–ইনামুরায়া দৌড়োতে দৌড়োতে চ্যাঁচাতে লাগলেন–“আমাকে আমার কথা রাখতে দে!”

      দৌড়োতে দৌড়োতে তিনি তলোয়ারের একটা কোপ মারলেন চেরিগাছটাকে লক্ষ্য করে। তার ফুলভর্তি একটা ডাল কেটে গিয়ে ইনামুরায়ার মাথায় এসে পড়ল। ফুলের পাপড়ি ঢুকে গেল তাঁর গলায়। তিনি এমন রেগে গেলেন যে মহাকবির এই কবিতার লাইনগুলো তাঁর ভাববারই সময় হলো না।

                  চেরিফুলের শোভা,গন্ধ,

                  মধুর হাসি মৃদুমন্দ–

                  যেমন হাসি ফুটে ওঠে,

                  রূপসী এক মেয়ের ঠোঁটে।

 

       উড়ন্ত চেরিগাছটি ও-তাইকে নিয়ে উত্তরে নাগাসাকির দিকে গেল। তারপর পুব দিকে মোড় নিয়ে ৎসুশিমা বলে একটা নির্জন দ্বীপে নামল। তিনটে পুরো বছর ও-তাই এখানে কাটাল। চেরিগাছটা ও-তাইয়ের মায়ের মতোই তাকে আগলে রাখত, তার প্রয়োজনীয় সবকিছু এনে দিত।

 

         এভাবেই নিশ্চয়ই আরও অনেক দিন তারা সেখানে কাটাত, যদি না এর মধ্যে দু’জন জেলে এসে সেই দ্বীপে নৌকো নোঙর করত একদিন। তারা নাগাসাকির মাছের বাজারের জন্যে স্কুইড আর চাঁদামাছ ধরছিল, আর নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল।

         “কত কী ঘটে গেল এই বছরে”–একজন বলছিল, “সম্রাট কলেরায় মরলেন, আর ভূমিকম্পে পুরো ইয়েদো শহর (এখনকার টোকিয়ো) ধসে গেল। শুনলাম, হাকোদাতে শহরে তিনজন সামুরাইয়ের মধ্যে তৰ্ক হচ্ছিল যে, একটা জ্যান্ত হাঙ্গরকে একলা খেতে পারবে। তা একটা হাঙ্গরই তাদের তিনজনকে খেয়ে নিয়েছে। কিয়ুশু শহরে তিনজন সাধু বুদ্ধের একটা রুপোর মূর্তি চুরি করেছিল বাজারে বেচবে বলে। তারা সেটা গলিয়ে ছোটো ছোটো মদের রুপোর গেলাস করবার কাজে ছিল। এখন তাদের হাতে রুপো লেগে বসে আছে,  কিছুতেই তা ছাড়াতে পারছে না।”

 

       অন্য জেলেটি আরও কিছু খবর জুড়ে দিল–”আর দ্যাখ না, এবার হোন্দো এলাকায় ধানটান কিছুই হয়নি। তাই গরিবেরা কাদার রুটি বানিয়ে খাচ্ছে। আর মোজিতে কী হয়েছে–একটা গরিব লোক এক বড়লোকের ঘোড়ার গোবর দিয়ে রুটি বানিয়ে খাচ্ছিল। আর তাই তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলে শাস্তি দেওয়া হলো। নাগাসাকির সাইহোজা মন্দিরের বড়ো পুরোহিত বলে কী জানিস? বলে যে, তার এক পূর্বপুরুষ এখন চাঁদামাছ হয়ে জন্মেছে। সে হয়তো বিনে পয়সায় আমাদের ধরা সব  চাঁদামাছ নিয়ে নেবে।”

 

      প্রথম জেলে আবার বলতে লাগল, “আমি শুনলাম যে বীর সামুরাই ইনামুরায়া তাকৎসুরা খুব অসুস্থ, ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্ন দেখে তিনি বিছানা নিয়েছেন। তাঁর আয়ু আর মাত্র তিন দিন আছে, যদি না অসুখের দৈত্যকে শান্ত করে কেউ তাঁকে সারিয়ে দেয়। ডাক্তার বলেছে, যদি তাঁর কোনো আত্মীয় তার হাত কেটে অসুখের দৈত্যের পায়ে দেয়, একমাত্র তাহলেই সামুরাই  সেরে উঠতে পারেন। যতদূর শুনেছি, তাঁর কোনো আত্মীয়ই একটা হাত খোয়াতে এগিয়ে আসছে না।”

 

        জেলেরা নৌকোর পাল খুলে নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়ল। ও-তাই কিন্তু তাদের সমস্ত কথা শুনেছে !  শুনে সে পাগলের মতো হয়ে গেল। সে চেরিগাছের গায়ে নিজের গালটা ঠেকিয়ে বলল, “চেরি মা গো, আমি এখন কী করি? বাবাকে তো বাঁচাতেই হবে! এই আমি হাত কেটে দিচ্ছি, কে আমার বাবার কাছে নিয়ে যাবে এখন? হায় হায়, আমি কেন জেলেদের নৌকায় চড়ে বসলাম না, বলতাম যে দোহাই, আমাকে তোমরা আমার বাবার কাছে পৌঁছে দাও!” ও-তাইয়ের কান্না শুনে চেরিগাছের ডালগুলো শোকে নুয়ে পড়ল। তবু সে জিজ্ঞেস করল, “মা, এই তিন বছর যে আমার সঙ্গে ছিলি তাতে তোর কষ্ট হয়েছে?”

       “না, না, কষ্ট হবে কেন মা! কিন্তু ওই যে নাগাসাকি  থেকে জেলেদের নৌকোটা এলো, আর ওই সর্বনেশে সংবাদটা দিলো, আমার সব সুখ তো শেষ হয়ে গেল মা! আমি তো কিছুই জানতাম না বাবার অসুখের বিষয়ে। চলো এই মুহূর্তে আমরা বাড়ি ফিরে যাই!”–বলে সে চেরিগাছকে জড়িয়ে ধরল। তার গায়ে গাল ঘসে কাঁদতে লাগল। চেরিগাছটার বহুদিনের পুরনো শুকনো বাকলের মধ্য নানা দাগ, সে দাগের মধ্যে যেন একটু সান্ত্বনার ভাষাও খুঁজে পেল ও-তাই।

          চেরিগাছ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, মানুষগুলো কী অদ্ভুত জীব। তারা একই সঙ্গে ভালো আর শয়তান, বোকা আর জ্ঞানী, রাগী আর শান্ত, কুঁড়ে আর ব্যস্ত। কিন্তু সুখী দেখি খুব কম। সুখ যেন তাদের শত্রু!

          তবু সে ও-তাইয়ের পিঠে ডাল বুলিয়ে বলল, “ঠিক আছে, যা চাইছ তাই হোক।”

         এবার ও-তাইকে দেখা গেল উড়ন্ত চেরিগাছের একেবারে মগডালে চড়ে বসে আছে, আর গাছটা সাঁই সাঁই করে পুবদিকে দিকে উড়ে চলেছে সমুদ্রের ওপর দিয়ে।

 

       সেই মুহূর্তে বীর ইনামুরায়া তাকেৎসুরা মৃত্যুশয্যায় শুয়ে রোগের যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলেন আর অসুখ-দৈত্যকে আটকানোর জন্যে বলছিলেন, “দাও, আমার তরোয়াল দাও।” তাতে কোনো লাভ যে হচ্ছিল, তা নয়। চারপাশে লোকজন জড়ো হয়েছে–তারা তিনি কী বলছেন বুঝতে পারছে না। তাই হাল ছেড়ে দিয়ে প্রার্থনা করতে বসে গেছে। তবে ডাক্তার কথাটা বুঝতে পেরে বলে উঠলেন, “ওই তো, তোমার বাঁ-পাশেই তোমার তরোয়াল।” বলে তিনি চারপাশের শিশির সারি থেকে বড়ি ঢেলে ওষুধ তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

            “ওরে বাপরে! আমার তরোয়াল দেখছি পাহাড়ের চেয়ে ভারী হয়ে গেছে! তুলতেই  পারছি না।”  ইনামুরায়া বললেন।

        একথা শুনে, যারা শোক করবার জন্যে ভিড় করেছিল, তারা সবাই ঘর ফাঁকা করে বাইরে গেল। কারণ, এবার মৃত্যুকে ঢুকতে দিতে হবে। সে অস্থিরভাবে ছাদের সিলিঙে  অপেক্ষা করছিল। তারপর ঘাসের যে মাদুরের ওপর বদ্যিমশাই বসেছিলেন, তার তলা থেকে বেরিয়ে এলো অসুখ-দানব আর সে নির্জীব সামুরাইয়ের মুখে খুব জোরে জোরে একটা জাপানি হাতপাখা নাড়তে নাড়তে বলল তার কথাগুলো, যা শোনাল হাওয়ায় উড়ে যাওয়া শুকনো পাতার আওয়াজের মতো–”সামুরাই মশাই, আপনার তো আর সময় নেই। আপনি আর ষোলোবার নিশ্বাস নিতে পারবেন, তারপরে আমি আপনার গলা বন্ধ করে দেব।”

 

         আর সেই মুহূর্তেই একটা দমকা হাওয়ায় ঘরের ছাদের টালিগুলো ঝনঝন করে নড়ে উঠল। সেইকি চেঁচিয়ে উঠল, “ওরে সাবাশ! আমাদের যে চেরিগাছটা উড়ে চলে গিয়েছিল, সে আবার ফিরে এসেছে!”’

    অসুখ দানব কী করবে ভেবে না পেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এলো, কোথায় পালাবে বুঝতে পারল না।    

         ইনামুরায়া বিছানায় সটান উঠে বসলেন, আর বাতাসের গন্ধ শোঁকার মতো জোরে নিশ্বাস নিলেন–আহা, কী সুন্দর নতুন চেরিফুলের গন্ধ! বললেন, “কই, আমি তো চমৎকার শ্বাস নিতে পারছি এখন। এর মানে কী?  আমি কি তাহলে মরে গেছি?”

         সেইকি চেঁচিয়ে বলল, “প্রভু, এই চেরিগাছ ওই অসুখ-দানবকে ভাগিয়েছে, আপনার সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে এনেছে!”–বলে এসে একটা চেরিগাছের ডাল নিয়ে ঢুকল ঘরে, যার ওপরে মেয়ে ও-তাইয়ের ডানহাতটা রাখা ছিল।

           ইনামুরায়া “মা! তুই ফিরে এসেছিস!”–বলে মেয়েকে দেখতে ছুটলেন আর তলোয়ারের এক কোপে তার মাথাটা কেটে ফেললেন। “এই দ্যাখ, কেমন করে শপথ রক্ষা করতে হয়!” বলে হুকুম দিলেন, “যাও, ওই বেয়াদব চেরিগাছটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দাও। আর কিয়োতো থেকে একজন মহাকবিকে ডেকে নিয়ে এসো। সে এই গল্পটা নিয়ে কাব্য লিখবে! আমার কীর্তি অমর হবে।”    

       একজন সামুরাই হওয়া চাট্টিখানি কথা নয় !!


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up