কেমন করে বৃষ্টির জন্ম হলো ?
জ্যোতির্ময় দাশ
(মেক্সিকোর উপকথা)
প্রকৃতি বিজ্ঞানের বইতে লেখা আছে নদী-নালা, খাল-বিল-পুকুর–আর অন্যসব জলাশয় যেমন, সাগর-হ্রদ প্রভৃতির জল সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে উপরে উঠে ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে মেঘ হয়ে ভেসে বেড়ায়। তারপর সেই মেঘ একসময় বৃষ্টি হয়ে পৃথিবীতে ঝরে পড়ে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার মেক্সিকো দেশের উপকথায় বৃষ্টির জন্মের একটা সুন্দর গল্প আছে। তোমাদের জানাই, উপকথা হলো খুব পুরোনো কালের কাহিনি, যা লোকের মুখে মুখে অনেকদিন ধরে চলে আসছে।
এটা সেই সময়ের গল্প, যখন সারা বিশ্বে আকাশ-শহর আর পৃথিবী-নগর ছাড়া আর কোনো শহর ছিল না। মানুষ বাস করত শুধু এই দুটো শহরেই। তাই রাজাও ছিলেন কেবলমাত্র দুজন। একজন পৃথিবীর রাজা আর অন্যজন আকাশের। তখনকার লোকজনেরা কেউ কাউকে হিংসে করত না বলে দুই রাজার মধ্যেও বন্ধুত্বের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এমনিতে আকাশের রাজাই বেশি শক্তিমান ছিলেন। চন্দ্র, তারা, নক্ষত্রেরা সবাই তাঁকে সমীহ করে চলত। তাঁর কোনো আদেশ থাকলে তক্ষুনি কারো রাজত্ব কেড়ে নিতে পারা যেত সহজেই। কিন্তু তিনি তা করার কথা কোনোদিন ভাবেননি। রাজাদের মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব ছিল, তেমনি দু'দেশের প্রজাদের মধ্যেও কোনো রেষারেষি ছিল না। প্রজাদের মনে শান্তি ছিল।
এভাবেই খুব সুন্দর সময় কেটে যাচ্ছিল। আকাশ-রাজার একটি ছেলে আর পৃথিবী-রাজার একটি মেয়ে ছিল। আকাশ রাজপুত্র কেমন দেখতে ছিল, সে কথা গল্পে কোথাও বলা নেই। কিন্তু পৃথিবীর রাজকন্যা অসাধারণ সুন্দরী ছিল। সে রাজকন্যার রূপের কথা বলে শেষ করা যাবে না। যারাই তাকে একবার দেখেছে, তারা মুগ্ধ হয়ে বলাবলি করত—এমন রূপসী মেয়ে যে দেশে জন্মায়, সে দেশে ফুলের কোনো দরকার নেই! পৃথিবীর সব ফুল এক করলেও তারা রাজকন্যাকে টেক্কা দিতে পারবে না।
দেখতে দেখতে দু'দেশের রাজপুত্র আর রাজকন্যা বড় হয়ে উঠল। আকাশ-রাজার একদিন মনে হলো যে এবার যুবরাজের বিয়ের জোগাড় করতে হয়। তিনি আকাশ-রাজ্যের সব সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়েদের খোঁজ করে দেখাশোনা করতে লাগলেন। মন্ত্রী, কোটাল, সামন্ত, আমলাদের যাদের মেয়ে ছিল দেখলেন। কিন্তু কাউকেই তেমন পছন্দ হলো না। এমন সময় তাঁকে কেউ পৃথিবী-রাজকন্যার খবর দিতে, সেই অপরূপ রাজকন্যাকে দেখে আকাশ-রাজার পছন্দ হলো। সেকালে নিয়ম ছিল ছেলের বাবাকে মেয়ের বাবার কাছে গিয়ে বিয়ের কথা বলতে হবে। আকাশ-রাজা দূত পাঠালেন পৃথিবী-রাজার কাছে। দূতেরা ছিল বিনিগেন্দাস নামে অশরীরী ভূত। তারা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তারাদের দরজা খুলে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। ভূত হলেও তারা সব ভালোমানুষ ভূত।
পৃথিবীতে পৌঁছে রাজার সঙ্গে দেখা করতে তাদের কোনো অসুবিধেই হলো না। তারা অশরীরি বলে প্রাসাদের প্রহরীরা তাদের সদরে আটকাবে কী করে, তাদের তো চোখেই দেখা যায় না। সোজা রাজার কাছে পৌঁছে সব থেকে বয়স্ক বিনিগেন্দাস খুবই বিনয়ের সঙ্গে আকাশ-রাজার প্রস্তাব জানাল। পৃথিবী-রাজা মেয়েকে ডেকে পাঠালেন। রাজকন্যা মুখ নত করে সে বিয়ের প্রস্তাবে অসম্মতি জানাল। কারণ রাজকন্যা পৃথিবীর রাজপ্রাসাদের এক সাধারণ সৈনিককে ভালোবাসে। তাকে ছাড়া অন্য কাউকে আর সে বিয়ে করতে পারবে না। তারা অনেকদিনের প্রাণের বন্ধু!
পৃথিবী-রাজা তাঁর মেয়েকে প্রাণের থেকে বেশি ভালোবাসতেন। তাই তিনি মেয়েকে কিছু বললেন না। রাজা বিনিগেন্দাসদের বললেন যে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে চিন্তাভাবনা করে খুব শিগগিরই তিনি খবর পাঠাবেন। অশরীরী ভূত বার্তাবাহকরা নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! রাজবাড়ির পাহারাদারেরা তাদের আসা-যাওয়ার কিছুই জানতে পারল না।
পৃথিবী-রাজা ঠান্ডা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি ভেবে দেখলেন, পাত্র ভালো হলেও আকাশ-রাজার ছেলের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিলে তাঁর একমাত্র মেয়ে সুখী হতে পারবে না। তাই তিনি তাঁর দেশের অশরীরী বিনিগেন্দাসদের দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করার খবর পাঠালেন। বন্ধু হলে কী হবে, রাজকন্যার বিয়ে না করার কথা শুনে আকাশ-রাজা পৃথিবীর ওপর ভীষণ খেপে গেলেন। একবার তাঁর মনে এলো যে সূর্য-চাঁদ-তারাদের আকাশের খুব উঁচুতে পাঠিয়ে দেবেন যাতে পৃথিবীর লোকজন সূর্যের তাপ না পেয়ে ঠান্ডায় জমে বরফ হয়ে খুব মুশকিলে পড়ে যায়।
কিন্তু আগেই আমরা বলেছি যে তিনি সুবিবেচক, উপকারী রাজা ছিলেন। তিনি ভাবলেন, একজনের জন্যে সবাইকে শাস্তি দিলে অন্যায় হবে। আসল অপরাধী হলো সেই সৈনিকটা, যার জন্য রাজকন্যা তাঁর ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। তিনি ঠিক করলেন ওই সৈনিকটাকে সরাতে পারলে, রাজকন্যা ভবিষ্যতে বিয়ে করতে রাজি হলেও হতে পারে। একদিন সেই সৈনিকটি এক পাহাড়ের কাছ দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। আকাশ-রাজার আদেশে পাহাড় প্রকান্ড হাঁ করে রাস্তা জুড়ে দাঁড়াল। বেচারা সৈনিক গুহা মনে করে পাহাড়ের মুখের মধ্যে ঢুকে হারিয়ে গেল। সেদিনের পর থেকে তাকে আর কোথাও দেখা গেল না।
রাজার হাজার হাজার সৈন্যের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সৈনিকটির কথা কেউ চিন্তা করল না, কেবল পৃথিবীর দু’জন ছাড়া—একজন তার বিধবা মা আর অন্যজন পৃথিবী-রাজার় অপরূপা সুন্দরী রাজকন্যা। তারা দুজনেই শোকে আকুল হলো। মা কাঁদতে কাঁদতে আর দুঃখ করতে করতে একসময় কপাল চাপড়ে ছেলের নিরুদ্দেশ হওয়াকে দুর্ভাগ্য ভেবে মেনে নিল। কিন্তু রাজকন্যা খুব জেদি মেয়ে। রাজকন্যা তার প্রিয় বন্ধুটিকে ভুলতে তো পারলোই না, বরঞ্চ, একদিন রাজবাড়ি ছেড়ে সৈনিক যে পাহাড়ের পথে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই পাহাড়ের দিকে রওনা হলো। মনে মনে ঠিক করল বন্ধুকে নিয়ে তবে বাড়ি ফিরবে!
এদিকে আকাশ রাজা ওপর থেকে সবকিছু লক্ষ্য করছিলেন। রাজকন্যা তবু তাঁর ছেলেকে বিয়ে করার কথা না ভেবে সৈনিককে খুঁজতে যাবার সিদ্ধান্তে তিনি ভীষণ রেগে গেলেন। পৃথিবীকে শাস্তি দেবেন ঠিক করে ফেললেন। আকাশের সূর্য আগুনের গোলার মতো আগুন ঝরাতে লাগল। পৃথিবীর মাটি গনগনে উনুনের মতো তেতে লাল হয়ে গেল। রাজার কথা শুনে মেয়েরা সব ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। জলের অভাবে পৃথিবীর গাছপালা, ঝোপঝাড়, ঘাস সব জ্বলেপুড়ে শুকিয়ে মরে গেল। রাজকন্যা আর পথঘাট কিছুই চিনতে পারল না। তবু মনের জোরে সব কষ্ট সহ্য করে শেষ পর্যন্ত সেই গুহার কাছে পৌঁছে গেল, যেখানে সৈনিককে পাহাড় বন্দী করে রেখেছে।
রাজকন্যার গলা শুকিয়ে কাঠ, জলের তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু সে সৈনিককে দেখতে পেয়েছে সেই গুহার মধ্যে। আনন্দে সব কষ্ট ভুলে সে গুহায় ঢুকতে যাবে, তখন আকাশের এক প্রহরী বিদ্যুতের তরোয়াল হাতে তার পথ আটকে দাঁড়াল। রাজকন্যা খিদে-তেষ্টায় আর পথের কষ্টে পরিশ্রান্ত। একা খালি হাতে প্রহরীর সঙ্গে কী করে আর লড়াই করবে? সে যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ল। তার দু’চোখ বেয়ে নেমে এল হতাশার অশ্রুজল, অবিরাম ধারায়।
রাজকন্যার চোখের জল ঝড়ো হাওয়ায় ছড়িয়ে গিয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে লাগল পৃথিবীর সবখানে—পাহাড়, অরণ্য, খেত-খামার, শহর আর গ্রামে। রাজকন্যার দুঃখের কান্নায় নতুন করে বেঁচে উঠল পৃথিবীর গাছ-পালা-ঘরবাড়ি সবকিছু। তারপর একদিন তার চোখের জল শেষ হতে তার শরীরটা একটা পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো! সৈনিকদের বন্দীশালার বাইরে চির প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকল সেই মূর্তি প্রহরীর মতো। রাজকন্যা মারা গেল বটে, কিন্তু তার চোখের জল বৃষ্টি হয়ে বাঁচিয়ে গেলে পৃথিবীকে!
মেক্সিকোর গ্রামের মানুষরা আজও বৃষ্টিকে বলে ‘নিমখিয়ে’। নিমকে বাংলা করলে হবে ‘জল’ আর ‘খিয়ে’-র মানে হল পাথর—অর্থাৎ পাথরের অশ্রু। তারা তাদের রাজকন্যাকে বৃষ্টির মধ্যে এভাবেই মনে রেখেছে।
পাঠকদের মন্তব্য
250