শজারু আর হাতির গল্প
অশোককুমার মিত্র
(অরুণাচলের লোককথা)
এক ছিল শজারু আর ছিল তার এক ভাইপো। ভাইপোকে নিয়ে শজারুর দিন কাটে। একদিন তার বড় তেষ্টা পেল। সে ভাইপোকে বলল, “যা তো বাপু, নদী থেকে আমার জন্যে এক পাত্তর জল নিয়ে আয়। খেয়ে বাঁচি।”
ভাইপো শজারু ছুটল তার কাকার জন্যে জল আনতে। নদীতে গিয়ে দ্যাখে জল বিচ্ছিরি ঘোলা। সে নোংরা জল না এনে খালি হাতে ফিরে এলো। তা দেখে কাকা শজারু রেগে টং। কাকার রাগ দেখে ভাইপো বলল, “কাকা, নদীর জল বড্ড নোংরা ছিল, তাই আনিনি।”
কাকা বললে, “তাই নাকি ? তবে, চল তো দেখি, কে নোংরা করেছে নদীর জল!”
এবারে ওরা নদীতে এল। নদীর জল সত্যিই কাদাগোলা। তা দেখে শজারু বলল, “আচ্ছা, চারিদিকে ঢুঁ মেরে আয় তো ! দেখে আয় কে জল নোংরা করছে? তুই তাকে বলবি—আমার কাকা জল খাবে। যেন জল নোংরা না ক’রে সে এক্ষুনি দূরে চলে যায়।”
ভাইপো শজারু কাকার কথা শুনে নদীর তীর ধরে খানিক এগিয়ে দেখল যে এক বিশাল হাতি নদীর বুকে নেমে শুঁড় দিয়ে হুস্ হুস্ করে জল টেনে চারদিকে পিচকিরির মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার খেলার চোটে গোটা নদীর জল ঘোলা হচ্ছে।
তা দেখে ভাইপো শজারু বলল, “হাতিবাবু, এবার আপনাকে খেলা বন্ধ করতে হচ্ছে। আমার কাকা জল খেতে পারছে না। এবারে আপনি উঠে পড়ুন।”
হাতি বলল, “কে তোর কাকা? সে কি আমার চেয়েও বড়? তা যদি হয়, তবেই আমি উঠব। যা, তোর কাকাকে এখানে নিয়ে আয়, চোখে দেখি। বড় হলে নিশ্চয়ই উঠে যাব।”
হাতি জানত যে তার চেয়ে বড় চেহারার জানোয়ার বনে আর নেই। ভাইপোর কাছে হাতির কথা শুনে শজারু তার গায়ের থেকে একটা মোটা কাঁটা তুলে তার হাতে দিয়ে বলল, “যা, এটা দেখিয়ে হাতিকে বলবি—এই তো কাকার চুল। ওর চুল এই কাঁটার চেয়ে যদি মোটা হয়, তাহলে আমি ওর কথা শুনব—নইলে এমন কথা বলার জন্য হাতিকে ক্ষমা চাইতে হবে।”
কাঁটা নিয়ে ভাইপো গেল হাতির কাছে। তাকে কাঁটাখানি দিয়ে কাকার কথা বলল। হাতি সেই কাঁটা নিয়ে তার লেজের চুলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল সে চুল ভারী পাতলা। তখন শজারুর কাছে ক্ষমা চেয়ে বোকা হাতি নদী ছেড়ে চলে গেল। শজারু খুশি মনে জল খেতে লাগল।
তার কদিন পরে হাতির সঙ্গে শজারুর ফের দেখা হলো। হাতি গাছ-পাতা খেতে খেতে বনের পথ ধরে আসছিল, আর শজারু একটা সরল গাছের নিচে তখন খেলছিল। শজারুর গায়ে খোঁচা খোঁচা কাঁটা দেখে ওকে কীভাবে হারিয়ে দেবে হাতি তা ভাবছিল। একটু মজা করার জন্যে শজারু হাতিকে বলল, “ধরুন, ধরুন—এ গাছটাকে জড়িয়ে ধরুন। আমিও এদিক থেকে ধরছি। নইলে গাছটা এখুনি ভূঁয়ে পড়বে আর আপনি-আমি দুজনেই চাপা পড়ে অক্কা পাব।” ভয় পেয়ে হাতি একদিকে গাছটাকে শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে রইল। অল্পক্ষণ পরে শজারু বলল, “ঠিক করে ধরে থাকুন, আমি…এই এক মিনিট—একটু কাজ সেরে এলুম বলে। হ্যাঁ, নড়বেন না”—এ কথা বলে তো সে গাছ ছেড়ে অন্য পথে পগারপার। আর বোকা হাতি গাছ জড়িয়ে ঠায় পাঁচদিন কাটিয়ে দিলো।
পাঁচদিন বাদে ক্লান্ত হয়ে ভয়ে ভয়ে গাছটা ছেড়ে সে দেখছিল গাছটা কোনদিকে পড়ে। তা গাছটা পড়বে কী, খাড়া দাঁড়িয়ে রইল। হাতি তখন বুঝল যে শয়তান শজারু তাকে ফের ভারী ঠকান ঠকিয়েছে। তাকে কঠিন শাস্তি দেবার জন্যে হাতি এবার হন্যে হয়ে বনে ঘুরতে লাগল।
এমনি ঘুরতে ঘুরতে একদিন সে শজারুর আস্তানায় এসে হাজির হলো। শজারু তখন একটা মস্ত পাথরের চাঁইয়ের পাশে দাঁড়িয়েছিল। হাতিকে দেখে সে “মরে গেলাম বাবা, মরে গেলাম” বলে চিৎকার করতে লাগল। তার চিৎকার শুনে হাতি পাথরের দিকে খানিক এগিয়ে এসে শজারুকে দেখতে পেল। সে আরো এগোতে শজারু বলল, “দেখছ, বন্ধুর বিপদের দিনে ঠিক বন্ধুর দেখা মেলে। আমি পাথর চাপা পড়েছিলাম। তুমি এসেছ, এবারে বাঁচব। পাথরটাকে এদিক থেকে ঠেলছি, তুমি ওদিক থেকে চেপে ধরো— ভালো করে ধরো—।”
শজারুর কথা বলার ভঙ্গিতে হাতির রাগ গলে জল। সে এগিয়ে এসে পাথরের একটা দিক চেপে ধরল। শজারু তা দেখে পাথরের আড়াল থেকে শটকে পড়ল। হাতি তো তা জানে না ! সারাদিন সে পাথর চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। শেষে যখন তার খুব খিদে পেল, তখন সে হেঁকে বলল, “বন্ধু, আমার খুব খিদে পেয়েছে। আমি একটু খেতে যাচ্ছি, ফিরে এসে আবার ধরব। তুমি এখন ভালো করে ধরে রাখো।” দু’বার ডেকেও যখন শজারুর কোনো সাড়া পেল না, তখন সে চারদিকে চেয়ে কোথাও শজারুকে দেখতে না পেয়ে ভীষণ রেগে গেল। ভাবল, শয়তান শজারুকে শায়েস্তা করতেই হবে। শজারু ততক্ষণে অন্য জায়গায় তার নতুন আস্তানা খুঁজে নিয়েছে।
তারপরে অনেককাল কেটে গেছে, একদিন শজারুর হঠাৎ মনে পড়ল হাতির কথা। তাই একদিন সে আগের পাড়ায় ফিরে চলল। পথে হাতির সঙ্গে দেখা। হাতি তো তার ওপর আরেকটু হলে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। তা দেখে এক পাশে সরে গিয়ে শজারু চিৎকার করে বলল, “আরে আরে, তুমি আমায় মারতে এসো না, তাহলে তুমিই মরবে।”
এ কথা শুনে হাতি একটু থমকে দাঁড়াল, তারপর সামলে নিয়ে বলল, “তুমি দু’বার আমায় ফাঁকি দিয়েছ, এবারে তোমায় বাগে পেয়েছি। উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব, কিছুতে ছাড়ব না।”
শজারু বলল, “ঠিক আছে। কাল একবাজি লড়াই হোক, যদি তুমি জেতো তাহলে আমায় না হয় মেরো! আর আমি জিতলে—না তোমায় মারব না, কী করব তা তখন ঠিক করব।”
তার কথায় হাতি রাজি হলো। হাতি জানে, শজারুর কাছে বাজি জেতা খুবই সহজ ব্যাপার।
পরদিন ঠিক হলো দুজনে দুই দু’জায়গায় গর্ত খুঁড়ে অন্যদিক থেকে বেরুবে। যে আগে বেরুতে পারবে—লড়াইয়ে তারই জিৎ। শজারু বলল, “তুমি এদিক থেকে শুরু করো, আমি উল্টোদিক থেকে শুরু করছি।” একথা বলে সে উল্টোদিকে চলে গেল। হাতির হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্যে সেখানে শজারু আগেই মস্ত এক গর্ত খুঁড়ে রেখেছিল। এবারে সেখান থেকে শুরু করে হাতির অনেক আগেই সে উল্টোদিকে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এসে হাতির গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে থাকল, “ছ্যা, ছ্যা—একটা গর্ত খুঁড়তে দেখছি দিন কাবার করে দেবে।” হাতি তা শুনে ওপরে উঠে এলো।
প্রথম লড়াইয়ে শজারুর জিৎ হলো।
পরের দিন দৌড়ের লড়াই হবে। শজারু তার বয়সী বন্ধু শজারুদের দৌড়ের পথের নানা জায়গায় আগে থেকে দাঁড় করিয়ে রাখল। দৌড় শুরু হতে হাতি তো শজারুকে ছাড়িয়ে অনেক এগিয়ে গেল। এগোতে এগোতে বলতে লাগল, “এবারে শজারু হারছে, তাকে তো এবার মরতেই হবে।” তখন সামনে দাঁড়ানো বন্ধু শজারু বলল, “কেন শজারুকে মরতে হবে, আমি তো তোমার জন্যে আগে থেকেই অপেক্ষা করছি।” তা শুনে হাতি ঘাবড়ে গিয়ে ভাবল শজারুটা এর ভেতরে এতখানি চলে এসেছে ! বাপ রে কী জোরে ওটা ছোটে! তাহলে? আর তা ভেবেই সে লতাপাতা কাঁটা বনের ভিতর দিয়ে প্রাণপণে ফের ছুটল। এ-দৌড়ে জিততে না পারলে তার মান থাকবে না।
অনেকখানি দৌড়ে এসে সে যেমনি পিছন ফিরে শজারু কত দূরে আছে দেখতে গেছে, তখনি সামনে থেকে আরেক শজারু বলল, “এ তো দেখছি নাবালকের সঙ্গেও দৌড়ে হারবে।” হাতি কিছু বুঝতে না পেরে আরো জোরে ছুটল। সমস্ত দম জড়ো করে ছুট লাগাল। ছুটতে ছুটতে তার দম ফুরিয়ে এল! না, আর সে পারে না। এবারে দাঁড়াতে হবে। সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন সামনের এক বন্ধু শজারু বলল, “সে কী, দম ফুরিয়ে গেল? ঠিক আছে, কাল এখান থেকেই দৌড় শুরু হবে। তুমি কাল সকালে বরং এখানেই এসো।”
তার কথা শুনে বোকা হাতি ভাবল, শজারুর সঙ্গে দৌড়ে কিছুতেই পারব না। তার চেয়ে কাল সকালের আগে এ বন ছেড়ে পালাই।
সত্যি শোনা যায়, শজারুর ভয়ে বন ছেড়ে হাতি মাঠে নেমে এলো। আর সে বনে ফিরল না। অরুণাচল প্রদেশে শজারুর ভয়ে হাতি নাকি বন-পাহাড়ে না থেকে মাঠে-ঘাটে থাকতে চায়।
পাঠকদের মন্তব্য
250