টিফিনবক্স
পিয়ালী ভট্টাচার্য
ঋদ্ধি আজ স্কুলে পৌঁছেই প্রেয়ার লাইনে যাওয়ার আগে টিফিনবক্স খুলে গন্ধ শুঁকে নিয়েছে। কতদিন ধরে মায়ের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে তবে এই টিফিন পাওয়া গেছে। ক্লাস থ্রির ছাত্রী ঋদ্ধি। এতটা উঁচু ক্লাসে পৌঁছেও নার্সারির মতো টিফিন পায়। বড়োদের মতো টিফিন এই প্রথম কত সাধ্য-সাধনা করে পেল। আলুর পরোটা নিয়ে এসেছে আজ। তর সইছে না তার। সেই দেড়টায় টিফিন ব্রেক। প্রতি ক্লাসের ঘণ্টা শেষে ম্যাম ক্লাস ছাড়লেই চট করে দেখে নেয়। গোল গোল লালচে, তেল চকচকে ও মাঝে মাঝে হালকা ফুলে থাকা আলুর নরম ছোঁয়া! আহা! জিভে জল এসে যাচ্ছে যেন।
কিন্তু দেড়টা যেন আর বাজছে না। হিস্ট্রি ক্লাসের পরেই টিফিন ব্রেক। ঋদ্ধি বোঝে মায়ের খুব কষ্ট হয়। সকাল সকাল রান্নাবান্না করে মাকেও তো স্কুলে যেতে হয়। তার ওপর টিফিনের বায়না কি চলে! কিন্তু ও আর কি করবে! ওর যে ভালো ভালো খেতে ইচ্ছে করে। স্কুলের ক্যান্টিনে সব পাওয়া যায়। বিরিয়ানি, চাউমিন, ডিম টোস্ট, এগরোল ইত্যাদি। সুলেখারা মাঝেমধ্যে খায়। কিন্তু তার মা হাতে টাকা দেয় না। বলে- "এই বয়সে আবার টাকা কী!" কিন্তু তার তো খেতে ইচ্ছে করে। মা সেই তাড়াহুড়ো করে ডিম সেদ্ধ, কলা, বিস্কুট বা স্যান্ডউইচ দেয়। কোনোদিন শুধুই ফল। এসব খাবার একদম ভালো লাগে না তার। আজ অনেকদিন পর বায়না করে আলুর পরোটা পেয়েছে। তাই কতক্ষণে চেখে নেবে সেই আশায় জিভে জল আসছে বারবার।
সেই কতক্ষণ ধরে হিস্ট্রি ক্লাস হওয়ার পর এই ব্রেক পাওয়া গেল। আজ আর বাইরে যাবে না সে। খেলার দিকে গেলে অনেকটা সময় চলে যায়। কোনোও কোনোও দিন ভুলেও যায় টিফিন খেতে। মা খুব রাগ করে টিফিন ফেরত নিয়ে গেলে। আজ ফেরত নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। দীপ্তি, অদ্রিজা ও লহর যতক্ষণ বাইরে খেলতে না যাচ্ছে, ততক্ষণ বক্স খোলা যাবে না। এদিকে খাবারের গন্ধও নিতে ইচ্ছে করছে। হালকা করে খুলে সে সন্তর্পণে গন্ধটা নিচ্ছে। এমন সময় রুমেলা পিছন থেকে এসে এমনভাবে পিঠে আঘাত করে 'ধাপ্পা ' বলল যে টিফিনবক্সের ঢাকনাটা গেল পড়ে। সবাই দেখে নিল তার টিফিন। ব্যাস ! কেউ আর খেলতে যাচ্ছে না। মাটিতে পড়ে থাকা ঢাকনাটা দিয়ে ঢাকাও যাচ্ছে না। আবার জল দিয়ে ধুয়ে আনতে গেলে যদি টিফিনটাই গায়েব হয়ে যায়!
গত বছর একদিন পাটালি গুড় এনেছিল সে। রোহণ জানতে পেরে টিফিনবক্স থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে খেয়ে নিয়েছিল। এবার যদিও ও অন্য সেকশনে চলে গেছে। কিন্তু এবারে অদ্রিজা আছে। ওকেও বিশ্বাস নেই। শুধু চেয়ে চেয়ে টিফিন খাবে। রুমেলার সঙ্গে এবার আড়ি করে দিতে হবে। ওর জন্যই এমন অঘটন ঘটে গেল। দীপ্তি গুটি গুটি পায়ে এসে বলল, "আমাকে একটু আলুর পরোটা দিবি ? "–ঋদ্ধি কৌতূহলী হয়ে বলল, “তুই কি টিফিন এনেছিস রে ?" মুখ চুন করে দীপ্তি উত্তর দিল, "রুটি আর বেগুন ভাজা।" ঋদ্ধি মুখ বেঁকিয়ে বলল, "তবে আজ আর তোর সঙ্গে টিফিন ভাগ করা হবে না রে।” অদ্রিজা আবহাওয়া ভালো নয় বুঝতে পেরে ছুটে এসে ওর পাশে বসে বলল, "আমি আজ চিকেন স্যান্ডউইচ এনেছি।" শুনে ঋদ্ধির মন অদ্রিজার প্রতি খানিকটা গলে গেল। ওর সঙ্গে ভাগ করা যেতে পারে। কিন্তু দীপ্তির সঙ্গে কোনোমতেই চলবে না।
লহর এসব গল্পে নেই। ও চলে গেছে খেলতে। অন্যরা নিজেদের মতো ভাগাভাগি করে খাচ্ছে। ঋদ্ধির ক্লোজ বন্ধুরা কিন্তু আজ নাছোড়। রুমেলা আহ্লাদি সুরে বলল, "আমি শুধু রুটি আনিনি। চকলেটও এনেছি।" চকলেটের প্রসঙ্গে ঋদ্ধির চোখ চকচক করে উঠল। দীপ্তি উৎসাহ নিয়ে বলল, "আমিও ক্যাডবেরি এনেছি।" ঋদ্ধি মনে মনে ভাবল, এদের বাদ দিয়ে পরোটা খাওয়া ঠিক হবে না। তাই একটু একটু করে পরোটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ভাগ করে রাখল। ওদের রুটি খাওয়া যাবে না। কিন্তু ক্যাডবেরি ও চকলেট তো ছাড়া যায় না। রুমেলা নিজের চকলেটটা অর্ধেক কামড়ে দিয়ে দিল। ওর পিসি ইরাক থেকে এনেছে। উটের দুধের তৈরি। ঋদ্ধির এত ভালো লাগলো যে বলেই ফেলল, "আর কয়েকটা আনতে পারলি না ?" সত্যি কথা বলতে ও তো এনেইছিল। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে খেয়ে নিয়েছে। দীপ্তিকে ও অদ্রিজাকে মুখ থেকে বের করে চকলেট দিল। ঋদ্ধির পরোটার ভাগ পেতে হবে বলে ও একটু বেশিই পেল।
দীপ্তি এবার নিজের ক্যাডবেরি বের করেছে। ঋদ্ধিকে একটুকরো ভেঙে মুখে পুরে দিল। অসম্ভব খারাপ খেতে এই ক্যাডবেরি। কে জানে ও এমন ডার্ক চকলেট খাওয়াবে। মুখটা বেজার করে কোনোমতে খেয়ে নিল ঋদ্ধি। অন্যরাও কিছুটা ভাগ পেল। সবার মুখই বিস্বাদ হয়ে গেল। দীপ্তি খুব খুশি। এদের ভালো লাগলে ওর ভাগে কম পড়ে যেত। ঋদ্ধি ক্ষেপে গিয়ে বলল, "ভাগ এখান থেকে। তোকে একটুকরোও দেবো না।" মন খারাপ হয়ে গেল দীপ্তির। অন্যরা একটু-আধটু পেলেও ওর কপালে জুটল না। সবাই সবার টিফিন ভাগাভাগি করে খেতে খেতে ব্রেক শেষ হয়ে গেল।
বাড়ি ফিরে সবকথা মাকে বলা চাই। মা তো শুনেই থ। মেয়ের কাণ্ড শুনে রেগে আগুন তেলে বেগুন। মা রাগত স্বরে বলল, "কেন সকলে ভাগ করে খেলি না!” ঋদ্ধি তো ভাবতেই পারছে না এমন টিফিন কি করে সকলকে দিয়ে নিজে কম খাওয়া যায়! তার ওপর দীপ্তির কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুদের কেউ ডার্ক চকলেট খাওয়ায়! ঋদ্ধি মাকে চটাতেও চাইছে না। হয়তো রাগ করে বাপুজি কেক আর কলা দিয়ে পাঠিয়ে দেবে। অন্য বন্ধুদের সামনে বেইজ্জতির এক শেষ হয়ে যাবে। তার চেয়ে মাকে বেশ গুছিয়ে আহ্লাদ করে বলল, "মা কাল তুমি এক্সট্রা আলুর পরোটা করে দেবে ? বন্ধুদের দিয়ে দিলে যে আমার পেট ভরবে না।" শুনে মায়েরও মন ভালো হয়ে গেল। আর যাই হোক, মেয়ে স্বার্থপর হয়নি। ছোটবেলায় কমবেশি সবাই এমন করে। মনে পড়ে গেল নিজের ক্লাসের বন্ধুদের কথা। টিফিন পিরিয়ডের সেই টিফিন ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্তগুলো জ্বলজ্বল করে উঠল যেন।
পাঠকদের মন্তব্য
250