শালিকছানা
মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ
ইশ্! ছানাগুলো সবে চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছিল, অমনি ডিস্টার্ব! মা-টাও না-! ভারী বিরক্ত টোটন। তবু মায়ের ডাকে সাড়া দেয় ও। কী মা, আমায় ডাকছ?
অঙ্কগুলো করছিস সোনা?
হ্যাঁ, করছি মা।
হিস্ট্রি? জিওগ্রাফি?
সব পড়ছি মা। তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো না।
একটু মন দিয়ে পড় সোনা।
পড়ছি তো। মন দিয়েই পড়ছি। তুমি মন দিয়ে রান্নাটা করো দেখি। যত্ত সব! সারাদিন শুধু ওই এক কথা। পড়, পড়, আর পড়! পড়া ছাড়া আর কোনও কথা নেই যেন! ওই তো, আবার তাকিয়েছে ওরা। চোখ পিটপিট করছে কেমন। ওমা, আবার হাঁ-করে হাইও তুলছে যে!
কী, ঘুম ভাঙল সোনামনা? প্রশ্ন করে টোটন। তোমাদের মা-টি কোথায় গেল শুনি? বাবা? সেই তো কখন থেকে তোমরা একা-একা গুটিশুটি মেরে বসে আছ। খিদে পায়নি বুঝি এখনও? ব্রেকফাস্ট হবে না? আমার যে সেই কখন হয়ে গেল।
টোটনের সব কথাগুলি যেন কান খাড়া করে শুনছিল ছানাদুটি। ওই যে, আড়মোড় ভেঙে আরও বড়ো-বড়ো চোখ করে তাকাচ্ছে ওরা। কিছু বলছেও বা যেন। তবে আর পড়াশোনায় মন যায় কারোর? অঙ্কগুলোও ভুলভাল হয়ে যাচ্ছে তাই সব। দুচ্ছাই, হিস্ট্রিটাও মাথায় ঢুকছে না কিছু। আবারও জানালার দিকে তাকায় টোটন। ওমা, এ যে একটা গুঁফো বেড়াল! আরে, ও তো দেখি ছানাগুলোর দিকেই তাক্ করে এগোচ্ছে! আরে-আরে, ওদেরকেই ধরবে নাকি গাঁক করে? আশ্চর্য! হেই-হেই-যাঃ-যাঃ-! ঠক্-ঠক্ করে জানালার পাল্লাটায় দুটো থাপ্পড় কসালো টোটন। মুখেও আরও জোরে শব্দ করল। আর তাতেই ঘটল যত বিপত্তি। নিচ থেকে আবার মায়ের গলা।
টোটন?
বই খুলে তটস্থ হয়ে বসে ততক্ষণে টোটন। স্বাভাবিক স্বরে সাড়া দেয়। কী মা? ডাকছ আমায়?
কার সঙ্গে কথা বলছিস?
কথা! ক-কই, কারো সঙ্গে না তো!
মন দিয়ে পড় সোনা।
আরে দূর! মন দিয়ে পড়ব কী, শালিকছানাদুটি যে ধুমসো বেড়ালটার খপ্পরে পড়ে সাবাড় হবার জোগাড়! ইশ্, কী যে করি এখন! হ্যাঁ, দারুণ একটা বুদ্ধি খেলেছে মাথায়।
অমনি তড়াক করে খাট থেকে লাফিয়ে পড়ে ঝুলঝাড়ুটা হাতে নিল টোটন। জানালা দিয়ে ওটিকে বাড়িয়ে ক-বার হই-হই করতেই হতচ্ছাড়াটা লম্ফ মেরে পগারপার। তাই দেখে ফিক করে হাসল টোটন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আর মনে-মনে বলল, যাক, বাঁচা গেল তবে এই যাত্রা।
ওই তো, ওদের মা-ও এসে পড়েছে দেখছি। সঙ্গে বাবাটাও বুঝি। ওমা, ডানা ঝাপটে কী আনন্দ করছে ছানাদুটি। এক্ষুনি খাবার-দাবার মিলবে কিছু বেশ বুঝতে পারছে!
কালও পড়তে বসে অনেকক্ষণ কথা বলেছে টোটন ছানাদুটির সঙ্গে। কী মিষ্টি দুটি পুচকে ছানা! ঠিক তুলোর পুটলি যেন। জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই ওরা দুটি ডানা ঝাপটে ওঠে। যেন ওর কাছেই আসতে চায়। কী মন দিয়ে কথা শোনে ওরা টোটনের ! সুর করে রাইমস পড়লে আরও কান পেতে থাকে যেন। মাথা তোলে। মিটমিট করে তাকায়। কখনও বা ফিক করে হাসছে মনে হয়।
বারান্দার পেয়ারাগাছটার ডালেই বাসা বেঁধেছে শালিকেরা। তাও আজ দিন পনেরো। তারপর জলজ্যান্ত দুটি ডিমও পাড়ল এক্কেবারে টোটনের চোখের সামনে। দেখে তো যারপরনাই আনন্দ ওর। অফিস থেকে ঘরে ফিরতেই বাবাকেও ডেকে দেখিয়েছে টোটন। বলতে গেলে, ওরাই যে এখন টোটনের বন্ধু। সকাল-বিকেলের সঙ্গী। স্কুল যাওয়ার আগে যেমন, স্কুল থেকে ফিরেও টোটনের একইরকম ছটফটানি ছানাদুটিকে নিয়ে। ইস্কুলের বন্ধুদেরও বলেছে ও শালিকছানাদের কথা। কিন্তু ওরা বিশ্বাসই করতে চায়নি কেউ টোটনের কথা।
দূর, পাখিরা আবার কথা বলতে জানে নাকি? মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল অনীক।
হ্যাঁরে, বলে বই-কি! আমার সঙ্গে ওরা দিব্যি কথা বলে। হাসে।
টোটনের কথায় ফোকলা দাঁতে হাসে তপু, অতনুরা।
হাসুক গে। তাতে কিছু মনে করে না টোটন। বরঞ্চ গর্বের সুরে জানায়, বেশ তো, আয় তবে আমাদের বাড়িতে একদিন। দেখতে পাবি সব।
ছানাদুটি এখন অনেকটা বড়ো। ডানায় অনেক পালক গজিয়েছে ওদের। ওর খুব ইচ্ছে, বাবার ক্যামেরায় একটা ছবি তুলে রাখে ওদের। কিন্তু কবে উড়তে পারবে ওরা? তখন টোটনকে ফেলে দূরে কোথাও পালিয়ে যাবে না তো? তবে বন্ধুত্ব কেমন করে থাকবে ওদের সঙ্গে? মনে-মনে ভেবে কষ্ট অনুভব করে টোটন।
আজ স্কুল থেকে ফিরেই মনটা খারাপ হয়ে গেল টোটনের। মায়ের দেওয়া ডিম-পাউরুটি খাবে কী, জানালার ফাঁক গলে বাইরের দিকে তাকাতেই ও অবাক। এ কী কাণ্ড! কোথায় গেল ছানাদুটি? বাসাটা এক্কেবারে ফাঁকা যে। আশ্চর্য! পড়ে যায়নি তো নিচে! বুকের ভেতরটা খাঁখাঁ করে উঠল অমনি টোটনের। আর ভাবতে পারে না ও। মনের অজান্তেই চোখদুটি ভিজে উঠছে ওর।
শালিক আর চড়ুইয়ের কিচিরমিচিরেই পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল টোটনের।
আরে,ওই তো তিনটে-চারটে শালিক। হ্যাঁ, দুটি পুচকে ছানাও রয়েছে ওদের মধ্যে। এক-পা এক-পা করে উঠোনে নেমে আসে টোটন। হাত বাড়ায়। ‘আয়-আয়’ বলে ডাকে। মুখে আদুরে সেই চ্চু-চ্চু শব্দ করে। কিন্তু ওরাই বা আমাদের বন্ধুত্ব মানবে কেন? মানুষের বন্ধুত্ব মানেই তো খাঁচাবন্দি হয়ে যাওয়া। মানুষ বড়ো নির্দয়। একে ভালোবাসা বলে কখনও?
শালিকছানাদুটি আরও একটু বড়ো হলেই বাবাকে বলে একটা খাঁচা কিনে এনে পুষবে ভেবেছিল টোটন। আদর করবে। ভালোবাসবে। আহ্লাদ করে খাওয়াবে। ভেবে যতটা না আনন্দ হয়েছিল তখন, আকাশের দিকে তাকিয়ে ওদের উড়ে যাওয়া দেখতে-দেখতে আরও বেশি আনন্দ হল আজ ওর। স্বাধীনতার মানেটাই যে তাই। বাঁধনহীন মুক্তি! বইয়ের স্তূপ আর বহুতলের বন্দিখাঁচায় শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে-নিতে এইসব ভাবে টোটন। ওরও যে কষ্ট হয় মাঝে-মাঝে। হাঁপিয়ে ওঠে বড়ো! ইস! একটিবার যদি ডানা মেলে উড়ে যাওয়া যেত। নিরুদ্দেশে। পাখিদের মতোই!
পাঠকদের মন্তব্য
250