ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্পগাথা / আগস্ট ২০২৬

উজ্জ্বল আলো

রিয়া বনবীথিকা বালিকা বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। তার একটি অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। সে সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন করত। একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় একটি কালো বিড়াল রাস্তা পার হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পাশের বাড়ির এক কাকিমা বললেন, “আজ আর বেরিও না। বিড়াল রাস্তা কেটেছে, অমঙ্গল হবে।”

রিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাকিমা, বিড়ালটা কি জানে আমি স্কুলে যাচ্ছি?”

কাকিমা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “এত প্রশ্ন করিস কেন? বড়দের কথা শুনতে হয়।”

কিন্তু রিয়ার মাথায় প্রশ্নটা ঘুরতেই থাকল। স্কুলে গিয়ে সে তার বিজ্ঞান শিক্ষক সৌম্য স্যারের কাছে বিষয়টি বলল।

স্যার বললেন, “আচ্ছা রিয়া, যদি বিড়াল রাস্তা পার হওয়ার কারণে অমঙ্গল হয়, তাহলে প্রতিদিন হাজার হাজার বিড়াল রাস্তা পার হয়—সব মানুষের কি অমঙ্গল হয়?”

রিয়া মাথা নাড়ল, “না তো!”

 

স্যার বললেন, “এটাই হলো যুক্তি। যে কোনো কথা সত্যি কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখতে হয়। শুধু শুনেই বিশ্বাস করা উচিত নয়।”

সেদিন স্যার পুরো ক্লাসকে একটি মজার কাজ দিলেন। সবাইকে এমন একটি কুসংস্কারের কথা লিখে আনতে হবে, যা তারা বাড়িতে বা আশপাশে শুনেছে।

পরের দিন ক্লাসে সকলে একটি করে কুসংস্কারের কথা লেখা খাতা জমা দিল—

কেউ লিখেছে, রাতে নখ কাটলে অমঙ্গল হয়।

কেউ লিখেছে, হাঁচি দিলে কাজ বন্ধ রাখতে হয়।

কেউ লিখেছে, গ্রহণের সময় খাবার খাওয়া যাবে না।

স্যার বোর্ডে সকলের কথা লিখে বললেন, “এবার আমরা খুঁজে দেখব, এগুলোর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ আছে কি না।”

ছোটোরা  উৎসাহে মেতে উঠল। রাতে নখ না-কাটার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জানা গেল, বহু বছর আগে বিদ্যুৎ ছিল না। অন্ধকারে ধারালো যন্ত্র দিয়ে নখ কাটলে আঘাত লাগার সম্ভাবনা ছিল। তাই মানুষ সাবধান করার জন্য এমন কথা বলত। পরে সেটাই কুসংস্কারে পরিণত হয়েছে।

স্যারের কথা শুনে রিয়া বিস্মিত হলো। সে বুঝতে পারল, কিছু কিছু বিশ্বাসের পেছনে আসলে পুরোনো সামাজিক কারণ থাকতে পারে।

 

দুই

 

কয়েকদিন পরে স্কুলে একটি বিজ্ঞানমেলা হলো। মূল দায়িত্ব সৌম্য স্যারের। সেখানে শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট পরীক্ষা প্রদর্শন করল। কেউ দেখাল, কীভাবে চুম্বক কাজ করে, কেউ দেখাল বায়ুচাপের প্রভাব, কেউ আবার সৌরশক্তির মডেল বানাল।

রিয়া একটি পোস্টার তৈরি করল— “প্রশ্ন করো, উত্তর খুঁজে নাও।”

পোস্টারের নিচে সে লিখল, “অন্ধবিশ্বাস মানুষকে ভয় শেখায়, বিজ্ঞান মানুষকে ভাবতে শেখায়।”

মেলায় তার পোস্টার সবার প্রশংসা পেল।

 

বাড়ি ফিরে রিয়া তার বাবা-মা’র সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করল। সে কাউকে অসম্মান করত না, কারও বিশ্বাস নিয়ে হাসাহাসিও করত না। বরং বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করত এবং তথ্য খুঁজে দেখাত।

ধীরে ধীরে তার ছোট ভাইও প্রশ্ন করতে শিখল। বন্ধুদের মধ্যেও কৌতূহল বাড়তে লাগল। তারা বই পড়া, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখা এবং নানা বিষয়ে আলোচনা করা শুরু করলো ।

একদিন সৌম্য স্যার ক্লাসে বললেন, “বিজ্ঞান মানে শুধু বইয়ের সূত্র নয়। বিজ্ঞান মানে সত্যকে খুঁজে বের করার চেষ্টা। আর যুক্তিবাদ মানে অন্যের কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে প্রমাণ ও যুক্তির সাহায্যে বিচার করা।”

 

রিয়া সেদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেল।

সে বুঝতে পারল, সমাজের সব মানুষ একদিনে বদলে যাবে না, কিন্তু প্রতিটি শিশু যদি প্রশ্ন করতে শেখে, পর্যবেক্ষণ করতে শেখে, বই পড়ে, পরীক্ষা করে এবং যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে, তাহলে ভবিষ্যতের সমাজ আরও আলোকিত হবে।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে আবার একটি কালো বিড়াল রাস্তা পার হলো।

রিয়া হেসে বলল, “বিড়াল তো তার পথেই যাচ্ছে, আমিও আমার পথে।”

তারপর সে নিশ্চিন্তে স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। কারণ সে জেনে গেছে— ভয়ের চেয়ে বড় শক্তি হলো জ্ঞান। আর কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো হলো বিজ্ঞান।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up