রঙ্গিল আর মিনারের ভূত
শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী
ভূত বলে কিছু হয় না। রঙ্গিল সেটা জানে। যখন তখন আজগুবি গল্প ফেঁদে বলবে, 'এই ভূত, ওই ভূত', এইসব রঙ্গিলের কাছে বললে আর পার পাবে না, কারণ রঙ্গিল এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। সে সবকিছুর ভিতরেই বিজ্ঞান খোঁজে, যুক্তি খোঁজে, আর তাকে সাহায্য করে তার তিন বছরের ছোট বোন, তিন্নি। সেও তো এখন ক্লাস সিক্স বলে কথা। নিউটন আর কোপার্নিকাসের কথা সে জানে। তাই ভূতের কথা বলে তার কাছে ছাড়া পাবে না।
এদিকে শহরজুড়ে শীত পড়েছে জাঁকিয়ে। স্কুলেও ছুটি পড়ে গেছে। শীতের ছুটি পড়লেই মন উড়ুউড়ু করে। কোথায় যাওয়া যায়, কোথায় যাওয়া যায়! ঠিক এই সময়ে রঙ্গিলের বাবা, শতানীক বলল, "এই ছুটিতে মধুপুর গেলে কেমন হয়?" শুনে মা বলল, "ভালোই তো হবে। ওখানে কাজলমাসি অনেকদিন ধরে আমাদের যেতে বলেছে। গেলেই হয়।" মধুপুর! সেই সহজপাঠের উশ্রীনদীর মধুপুর! শরৎচন্দ্রর গল্পকথার মধুপুর! রঙ্গিল আর তিন্নি একবাক্যে রাজি। অগত্যা বেরিয়ে পড়া গেল। অনেকদিন বাদে আবার সেই লং ড্রাইভ। রঙ্গিলের বাবাই স্টিয়ারিং ধরেছে। নিমেষের মধ্যেই যেন চলে এল আসানসোল। তারপর ডানদিকে সরু জামতারার রাস্তা হয়ে ঝাড়খণ্ডে ঢুকে পড়ল ওরা। রঙ্গিল অবাক হয়ে দেখছিল চারপাশ। বাংলা ছাড়তেই তার আশপাশ কেমন রুক্ষ পাথুরে হয়ে উঠছে। যেতে যেতে মা বলল, "মধুপুর কিন্তু ভূতের জন্য বিখ্যাত। জানিস তোরা? একটা গোটা পাড়া আছে যেখানে অনেক বড় বড় সুন্দর দেখতে বাড়ি। অথচ কেউ থাকে না।" এইসব শুনে রঙ্গিল আর তিন্নি প্রায় একসঙ্গেই বলল, "ভূত বলে কিছু হয় না।"
কাজলমাসির বাড়িটা বেশ অন্যরকম। ছোট্ট লোহার দরজা পার হলেই বেশ বিস্তৃত ঠাকুরদালান। সেই দালানে সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো অষ্টধাতুর দুর্গামন্দির। নিয়মিত পুজো করেন পুরুতমশাই। তার গা ঘেঁসে পটুয়ার ঘর। সেখানে সারবদ্ধ সরস্বতীমূর্তি। সবেমাত্র মাটি লেপা হয়েছে। ছাঁচের মুখ বসেছে কারো কারো। সেসব পেরিয়ে বড় বড় থামওলা কাজলমাসির বাড়ি। কাজলমাসি মায়ের দূর সম্পর্কের বোন। এখানে একাই থাকেন। মাসি বিয়ে করেননি। তাঁর বাবা ছিলেন নামকরা ব্যারিস্টার। মাসিও ওকালতি করতেন তরুণী বয়সে। পরে অবসর নিয়ে এই প্রকাণ্ড বাড়িতে একাই থাকেন। বাগান, ঠাকুরদালান, পটুয়ার ঘর একা দেখভাল করেন। সহকারী বলতে এক আদিবাসী ছেলে বুধোয়া, আর মাসির সঙ্গে এক ঘরে বড় হয়ে ওঠা অনাথ মেয়ে লক্ষ্মী, এখন তাঁর সহচরী। আবার সহকারীও বটে।
–তোরা আসায় আমি যে কী খুশি হয়েছি, কথায় প্রকাশ করতে পারব না রে। এখন হাত ধুয়ে খেয়ে নে তোরা।
কাজলমাসি সব বন্দোবস্ত করেই রেখেছিল। আলুপোস্ত, মুসুর ডাল আর কাতলা মাছ ভাজা। খেতে খেতে তিন্নি জানলা দিয়ে দূর থেকে দেখতে পাওয়া একটা টাওয়ার দেখিয়ে বলল,,"ওটা কী কাজলমাসি?"
মাসি হেসে বলল, "ওটা মিনার।"
রঙ্গিলের কৌতূহল হলো–"মিনার মানে ওয়াচটাওয়ার?"
খানিকটা সেইরকমই। আসলে ওই মিনারের লাগোয়া একটা রাজবাড়ি আছে। অনেকদিন আগে এখানে ডাকাতের খুব উপদ্রব ছিল। লোকে বলে, দূর থেকে নজর রাখার জন্যই ওই মিনার।
ওখানে যাব আমরা?
অবশ্যই যাবে। কিন্তু দিনের আলো থাকতে থাকতে।
কেন? দিনের আলো থাকতে থাকতে কেন?
কাজলমাসি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, "আসলে, সন্ধ্যার পর ওই জায়গাটা তেমন নিরাপদ নয়।"
রঙ্গিল আর তিন্নি চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। দুজনের মুখেই অসীম কৌতূহল। আর অজানা রহস্যের হাতছানি।
শীতকালে বেলা ছোট হয়ে আসে। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই বিকেল। রঙ্গিলরা মধুপুর ঘুরতে বেরিয়ে পড়ল কাজলমাসিকে নিয়ে। একটা জিনিস লক্ষ্য করল রঙ্গিল। এখানে প্রতিটি বাড়িতে একটা করে কুয়ো আছে। কুয়োর প্রচলন এতটাই, যে কখনও কুয়োর নামেই চৌমাথার নাম হচ্ছে। যেমন 'ডালমিয়া কুয়ো'। কাজলমাসিকে সেকথা বলতে মাসি বলল, "ঠিকই বলেছ রঙ্গিল। মধুপুরে কুয়ো আছে প্রতিটি বাড়িতেই। আসলে গরমে এখানে জলের অভাব থাকে তো। তোর মনে আছে মধুমিতা, ছোটবেলায় আমরা কেমন কুয়োর জলেই চান করতাম।"
কাজলমাসির কথার উত্তরেই রঙ্গিলের মা মধুমিতা বলল, "মনে আবার নেই। সেইবার আমার রুগ্ন শরীর এই মধুপুরের জলহাওয়াতেই তো কেমন ভালো হয়ে গেল। আমরা তো কুয়োর জলই খেতাম। তখন তো আর কথায় কথায় মিনারেল ওয়াটার ছিল না!"
কত কিছু দেখল রঙ্গিলরা। পাথরোলের কয়েক শো বছরের পুরনো কালীবাড়ি, সেন্ট কলম্বাস গির্জা, আরও কত কি! তবে এখনকার মধুপুরের সঙ্গে মায়ের সময়কার মধুপুরের বিস্তর ফারাক। এখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে জলের দোকান। বাবা বলল,"এখন আর সেইদিন নেই। মধুপুরের জল এখন বিষাক্ত। এই তো কিছুদিন আগে পড়লাম, এখানেই একটা কুয়োর বিষাক্ত জল খেয়ে এক গ্রামের বেশ কয়েকজন লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এমনকি একজন বোধহয় মারাও গেছে।"
মন খারাপ হয়ে গেল রঙ্গিলের। ঘরে ফেরার পথে সে বলল, "আচ্ছা একবার ওই মিনারটা দেখতে যাওয়া যায় না?"
দীর্ঘ পথযাত্রায় বাবা-মা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সেকথা বুঝতে পেরে কাজলমাসি বলল, "ঠিক আছে। বুধোয়াকে সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওর কথা ঠিকমতো বোঝা যাবে না ঠিকই। একে আদিবাসী, তার উপর ওর উচ্চারণের দোষ আছে। তবে ও এই জায়গাটা খুব ভালো করে চেনে। আমি ওকে বলে দিচ্ছি। তবে একটাই শর্ত। সন্ধ্যা হবার আগেই তোমাদের ফিরে আসতে হবে।"
অগত্যা বুধোয়াকে সঙ্গে করে রঙ্গিল আর তিন্নি চলল সেই রহস্যময় মিনার দেখতে। বুধোয়ার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। কুচকুচে কালো পেটানো দোহারা শরীর। চোখগুলো ক্ষিপ্র। মুখে শব্দ করে না তেমন, তবে অঙ্গভঙ্গি করে বেশ বোঝাতে পারে সবকিছু।
একটা বিশাল অট্টালিকা। গোলবারান্দা, বড় বড় থাম দেখে মনে হবে, এক্ষুনি যেন সেই বারান্দা থেকে কোনও রাজামশাই উঁকি দেবেন। হাত নেড়ে অভিবাদন জানাবেন। কিন্তু আসলে তেমন কেউই নেই। গোটা বাড়িটাই ফাঁকা। তার একপাশে একটা উঁচু সাদা মিনার। মিনারে ওঠার দরজাটা ভেঙে গেছে। তবে সিঁড়ি ঢাকা পড়ে গেছে নানান জংলা গাছগাছালিতে। রঙ্গিল দেখল সেই সিঁড়ি ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে উপর দিকে।
–ওদিকে যেও না খোকা। সাপ আছে।
রঙ্গিলরা চমকে পিছনে তাকাতেই দেখল সেখানে এক বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। পিঠ তার ধনুকের মতো বাঁকা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথায় সাদা টুপি। তবে মুখের হাসিটি বড় সুন্দর। রঙ্গিল জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকাতেই বুধোয়া অঙ্গভঙ্গি করে বোঝাতে চেষ্টা করল সে মানুষটাকে চেনে।
–আমার নাম নাসিরুদ্দিন আলি মির্জা। সবাই আমাকে নাসিরভাই বলে ডাকে। আমি এই বাড়ির দেখাশোনা করি।
স্পষ্ট বাংলা উচ্চারণ। হবে নাই বা কেন? নাসিরভাইয়ের আদিবাড়ি তো বর্ধমান। এখনও তার পরিবার সেই বর্ধমানেই রয়েছে। রঙ্গিল নাসিরভাইকে প্রণাম করে এগিয়ে গিয়ে বলল, “এই বাড়ির গল্প বলুন।”
নাসিরভাই বলতে লাগলেন। এই বাড়িতে থাকতেন এক জমিদার রাজা। তাঁর একটিই মাত্র মেয়ে। রাজা তাঁর রাণীকে নিয়ে খুশি। হঠাৎ একদিন গ্রামে অদ্ভুত এক অসুখের প্রকোপ দেখা দিল। প্রথমে হাত পা হলুদ হয়ে যাওয়া, জণ্ডিসের মতো। তারপর সারা গায়ে ফোসকার মতো কিছু। তারপর মুখে রক্ত উঠে মৃত্যু। অসুখে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে গেল। লোকে বলতে লাগল মধুপুরের জল বিষাক্ত হয়ে গেছে। রাণীমা ও রাজকুমারীর শরীরেও সেই অসুখ দেখা গেল। দুজনের কেউই বাঁচল না। লোকে বলে, রাজকুমারী নাকি তার বাবাকে বারবার বলত মধুপুরের জলে বিষ মিশেছে। মেয়ে আর বৌ হারিয়ে রাজা পাগল হয়ে গেলেন। একদিন এক বাঙালিকে বাড়ি-সম্পত্তি সব বেচে দিয়ে রাজা নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। তারপর থেকেই এই বাড়ি অভিশপ্ত।
নাসিরভাই বলে চললেন, “রাজা নিরুদ্দেশ হলে এই বাড়ি হাতবদল হয়ে এক বাঙালিবাবুর হাতে আসে। তিনি কলকাতায় অসুস্থ হলে নাসিরভাইকে দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। গেল পঁয়ত্রিশ বছর ধরে নাসিরভাইই এই বাড়ির দেখাশোনা করেন।
একটা প্রশ্ন বারবার ঘোরাফেরা করছিল রঙ্গিলের মনের ভিতর,”ওই মিনারের উপর যাওয়া যায়?”
চারপাশে আলো নিভুনিভু। নাসিরভাই থমথমে মুখ করে বলল, "ও পথে সাপ আছে। তাছাড়া অবশগুণ।"
রঙ্গিল আর তিন্নি চোখ চাওয়াচাওয়ি করে পরস্পর, ”অবশগুণ মানে?”
নাসিরভাই গলা নামিয়ে বলে, "রাজাবাবু হারিয়ে যাবার পর তার এই বাড়ি ভূতের বাড়ি বনে যায়। রোজ রাতে ওই মিনার থেকে কেউ আলো দেখায়। লোকে বলে রাজকুমারী এখনও ওই রাজবাড়িতে ঘুরে বেড়ান।"
“রাজকুমারীই কেন? রাণীমা বা রাজাবাবু নন কেন?”–প্রশ্ন করে রঙ্গিল আর তিন্নি।
“কারণ আমি নিজে চোখে দেখেছি…! একটা ছোট্ট মেয়ের ছায়া। মাঝেমাঝেই তাকে মিনারে উঠতে দেখেছি আমি। ওপরে উঠে যায় সে। তারপর মিনার থেকে আলো দেখায়। শুধু আমি নই, এই মধুপুরের অনেকেই তাকে দেখেছে…!”
নাসিরভাইয়ের কথায় বুধোয়াও মাথা নাড়ে সম্মতিতে। হাবেভাবে বোঝায়, সেও দেখেছে ওই ছায়া।
গভীর চিন্তা নিয়ে ফিরে আসে রঙ্গিল। ভূত বলে সত্যিই কিছু হয় কী? সে কথা জানতে গেলে তাকে একবার ওই মিনারে উঠতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? নাসিরভাই দেখলে তো আটকে দেবে তাকে। দেখা যাক। ঘরে ফিরতে বাবা সব শুনে বলল, "ওই ঝোপঝাড়-আগাছায় সাপ তো থাকতেই পারে। তার উপর এতোদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা মিনার। সিঁড়ির অবস্থাও ভালো থাকার কথা নয়। তাই তোদের নাসিরভাই আটকে ভালোই করেছে।"
কাজলমাসি বলল, "মিনারে ভূতের আলো আমিও দেখেছি। তাই তো তোমাদের রাতের অন্ধকারে ওদিকে যেতে বারণ করেছিলুম।"
শীতের নিশুতি রাত নেমে এলে মধুপুর সত্যিই যেন গা ছমছমে হয়ে ওঠে। রাতে ঘরের বারান্দা থেকে রঙ্গিল দেখল মিনারের চুড়ো থেকে আলো জ্বলছে। একটা সাদা টর্চের আলো যেন অন্ধকারের ভিতর কাউকে খুঁজছে। খুঁজেই চলেছে।
পরদিন সকাল সকাল রঙ্গিলরা উশ্রীনদীর ঝর্ণা দেখতে বেরিয়ে গেল। এই ঝর্ণা ঘিরে কত কথা, উপকথা। কত কবিতা, গল্প। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নেমে আসছে উশ্রীনদীর জল। তার উপর বসেই লোকের বনভোজন চলছে। সেখানেই বাসনকোসন ধোয়া। এসব দেখে বাবা আপনমনে বলল, "এই জন্যই নদীর জল এতটা দূষিত হয়ে ওঠে।" উশ্রী দেখার পর রঙ্গিলরা গেল খাণ্ডোলি। গিরিডির প্রকৃতি রঙ্গিলের বেশ পছন্দ হল। তিন্নি উৎসাহ নিয়ে বলল, "চলো দাদাভাই, আমরা বোটিং করতে যাই।" খাণ্ডোলিতে পাহাড় না চড়লেও বোটিং করল সকলে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মা বলল, "না রে। মধুপুরের জল আর আগের মতো নেই। গিরিডিতে ফলের দোকানের লোকটাও বলছিল। বোতলের জল কিনে খাওয়াই ভালো।"
“বুধোয়াকে দেখছি না…” রঙ্গিল কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল কাজলমাসিকে। মাসি উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,"বুধোয়ার মায়ের খুব অসুখ। বোধহয় জল থেকেই হচ্ছে। সকাল থেকে রক্তবমি। ভর্তি করেছে হাসপাতালে। তোর মা ঠিক বলেছে। মধুপুরের কুয়োর জল দূষিত হয়ে গেছে। তাই আমরাও জল কিনে খেতে শুরু করেছি।"
মন খারাপ হয়ে গেল রঙ্গিলের। রাতে সে একমনে মিনারের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু সে রাতে মিনারের আলো আর দেখা গেল না।
পরদিন রঙ্গিলরা সবাই ঠিক করল বুধোয়ার গ্রামে যাবে। বুধোয়ার গ্রাম পাশেই। সেখানকারই এক গ্রামীন হাসপাতালে বুধোয়ার মা ভর্তি। প্রথমে কাজলমাসি ঠিক করল হাসপাতালেই যাওয়া হবে। হাসপাতালের মেঝেতে শয্যাশায়ী রোগীদের দেখে রঙ্গিল আর তিন্নি, দুজনেরই খুব কষ্ট হল। কত কষ্ট করে অবহেলায় চিকিৎসা পাচ্ছে ওরা! বুধোয়ার মায়ের অবস্থা খানিকটা ভালো। রঙ্গিলদের আসতে দেখে বুধোয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বুধোয়ার জামার প্রান্ত খামচে ধরে রয়েছে ফ্রকপরা ছোট্ট বছর বারো-তেরোর একটি মেয়ে। ওকে দেখে তিন্নি জিজ্ঞেস করল,"কাজলমাসি, ও কে?"
কাজলমাসি হেসে বলল,"ও লছমি, বুধোয়ার বোন।"
বুধোয়ার মাকে সেদিন সন্ধ্যাতেই ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানালেন ডাক্তারবাবু। বুধোয়ার গ্রামে ঢুকে রঙ্গিল অবাক হয়ে গেল। সারা গ্রাম জুড়ে শুধু বোতলজলের বিজ্ঞাপন–’উশ্রী মিনারেল ওয়াটার'। সেসব দেখে কাজলমাসি যেন আপনমনেই বলল,"হবে নাই বা কেন, পুরো গ্রাম জুড়েই তো এই বিষাক্ত জলের প্রকোপ চলছে। গ্রাম অর্ধেক খালি হয়ে গেছে ভয়ে। প্রতিটি কুয়োয় কারা যেন বিষ মিশিয়ে গেছে।"
“পুলিশ কিছু করছে না কেন? রঙ্গিল বলল।
কাজলমাসি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তদন্ত করছে। এখানকার ডেপুটি আমার চেনা। মহেশ্বর চৌবে। আমার বহু কেসে আমার সঙ্গে একইসঙ্গে কাজ করেছিল। ওঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ও বলল, যারা কুয়োতে বিষ মেশাচ্ছে, তারা এত সাবধানে এই কাজটা করছে যে তাদের নাগাল পাওয়া খুব কঠিন। তবু পুলিস চেষ্টা চালাচ্ছে।”
“আচ্ছা কাজলমাসি, মধুপুরে এখন এই যে চারিদিকে বোতলের জলের রমরমা, সকলে কি কিনতে পারবে বলো? এরা তো সবাই খুব গরীব। তাহলে এরা কী করবে?” বলে রঙ্গিল।
“সেটাই তো। এই যে আজকাল দেখছি এই 'উশ্রী মিনারেল ওয়াটার'-এর রমরমা। ওদের জল তো আমরাও কেনা শুরু করেছি। উত্তরোত্তর বাড়ছে বোতলের দাম।” কাজলমাসির
হতাশ জবাব।
মন খারাপ হয়ে গেল রঙ্গিলের। ঘরে ফিরে রঙ্গিল তিন্নিকে বলল, "একবার যাবি? মিনারে?"
“যদি নাসিরভাই বারণ করে দেয়?”–বলে তিন্নি।
রঙ্গিল বলে, “দেখতে পাবে না। চুপিচুপি যাব।”
“বাবাকে বলে দেখ”–বলে তিন্নি।
রঙ্গিল পা টিপে টিপে ঘরে উঁকি মেরে দেখল মা আর কাজলমাসি উঠোনের দাওয়ায় বসে গল্প করছে। মন্দিরের পুরোহিত মন্দিরের বাইরেই শতরঞ্জি পেতে রোদ পোহাচ্ছে। আর বাবা একা একা নিজের ঘরে বসে বই পড়ছে। ভারতীয় সংস্কৃতির বই। স্বামী রঙ্গনাথানন্দ।
–বাবা। একটা কথা বলব?
–বল না।
–গতকাল কিন্তু ওই মিনারের আলো জ্বলেনি। মানে ভূতটা গতকাল রাতে আসেনি।
–ভূত বলে কিছু হয় রঙ্গিল?
–সেটাই তো। তাহলে কে জ্বালায় ওই আলো? সেটা মিনারে একবার না গেলে বোঝা যাবে বলো?
–বুঝেছি। তোর এখন ওই মিনারে তদন্ত করার মন করেছে, তাই তো? কিন্তু আজ তো বুধোয়া নেই। একা নতুন জায়গায় যাওয়াটা নিরাপদ নয়।
–আমি আর তিন্নি যাব।
–দাঁড়া। শালটা গায়ে জড়াই। আমিও যাচ্ছি চল।
বাবা সঙ্গে যাওয়াতে রঙ্গিল অনেকটা নিশ্চিন্ত হলো। এতে নাসিরভাইকে শান্ত করা সহজ হবে। অবশ্য মিনারের কাছে এসে নাসিরভাইকে চারপাশে কোথাও দেখতে পেল না ওরা। মিনারে ঢোকার দরজা ভাঙাই পড়েছিল। সেখান দিয়ে যেতে যেতে বাবা নিচুস্বরে বলল,"সাবধানে আসবি তোরা। আমার পিছে পিছে আয়। আমি টর্চ জ্বালাচ্ছি।"
টর্চের আলোয় ধীরে ধীরে বাবার পিছুপিছু পা ফেলে এগোচ্ছিল রঙ্গিল আর তিন্নি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে একটা আশ্চর্য জিনিস লক্ষ্য করল রঙ্গিল। সিঁড়ি কামড়ে পড়ে থাকা আগাছাগুলো জায়গায় জায়গায় যেন মিলিয়ে গেছে। বাবাকে একথা বলতেই বাবা বলল,"তুই কী বলতে চাইছিস, আমি বুঝতে পেরেছি রঙ্গিল। তার মানে এই সিঁড়ি দিয়ে রোজ রাতে সত্যিই কেউ মিনারে ওঠে।"
মিনারের উপরের চাতালটা একটা ছোট গোলবারান্দার মতো। সেই বারান্দায় এসে তিন্নি লাফিয়ে বলল, “দেখ দেখ দাদাভাই। গোটা মধুপুরটাই যেন এখান থেকে দেখা যাচ্ছে।”
রঙ্গিল হেসে বলল,"আরো মজার জিনিস হলো, গোটা মধুপুরের কুয়োগুলো সবকটা এখান থেকে একঝলকে দেখা যাচ্ছে।"
মিনার থেকে বুধোয়াদের গ্রামটাও দেখতে পেল ওরা। বাবা খানিক এদিকওদিক দেখে বলল, "চল। এবার ফেরা যাক।"
হঠাৎ রঙ্গিল থমকে গেল। দেয়ালের কাছে পড়ন্ত বিকেলের আলোয় কী একটা যেন চকচক করছে।
–বাবা, এখানে একটু টর্চের আলো দাও তো…!
আলো ফেলতেই দেখা গেল সেখানে একটা রূপালি নূপুর পড়ে আছে। রঙ্গিল সেই নূপুরটা হাতে তুলে নিয়ে বলল,"বাবা, অন্তত এটা বোঝা গেল, রাজবাড়ির রাজকন্যার ভূত নূপুর পরে।"
মিনার থেকে ফিরতে ফিরতে রঙ্গিল দেখল রাজবাড়ির সামনে খাটিয়া পেতে নাসিরভাই শুয়ে আছে। তার চোখমুখ শুকনো। বোধহয় শরীর ভালো নেই। কী হয়েছে কে জানে। রঙ্গিলরা আর তাকে ডাকল না। চুপিচুপি ফিরে এল। ঘরের পথে এসে বাবা বলল,"কী বুঝলি রঙ্গিল?" রঙ্গিল চিন্তিত হয়ে বলল, "মিনারের ভূত আর যাই হোক নূপুর পরবে না। কেউ একটা মিনারে উঠে ভয় দেখায় মধুপুরের লোকেদের।"
–কিন্তু তোর কাজলমাসি, তারপর পটুয়াকাকু, পুরুতঠাকুর, সবাই তো রাজকন্যার ছায়ামূর্তিকে মিনারের কাছে যেতে দেখেছে।
–ঠিক তাই। তাহলে আমাদের জানতে হবে আগে, মিনারের ভূত কেন মধুপুরের লোকেদের ভয় দেখাতে চায়।
–কেউ হয়তো রাজবাড়ি ভূতের বাড়ি প্রমাণ করে জলের দরে কিনতে চাইছে।
–বাবা, সেটাই যদি হয়, তাহলে ইতিমধ্যেই তো রাজবাড়িটা ভুতুড়ে বাড়ি হিসেবে প্রমাণিত। সেদিন নাসিরভাইকে দেখে মনে হল, ওনার মালিকও চাইছে বাড়ি বিক্রি করতে।
–তাহলে আর কী হতে পারে?
–সেটাই তো…!
কথা বলতে বলতেই একটা ম্যাটাডর পেরিয়ে গেল ওদের। ম্যাটাডরের চারদিকে 'উশ্রী মিনারেল ওয়াটার'-এর পোস্টার। সেটা দেখতে দেখতে রঙ্গিল বলল, "বাবা, এখানে এই বোতলজলের কারখানার ঠিকানা বলছে মধুপুরেই। একবার আমাদের নিয়ে যাবে ওখানে…?
–বেশ। তাহলে গাড়ি বের করি।
মিনারেল জলের কারখানাটা জামতারার দিকে। খানিকটা এগিয়েই বামহাতে। পুরো তৈরি হয়নি। বাউণ্ডারি এখনও পুরোটা শেষ হয়নি বলে খানিকটা ভিতরে ঢুকে পড়তে পারল রঙ্গিল। কারখানার গেটের বাইরে লম্বা ছোটহাতির লাইন দেখে সহজেই বোঝা যায়, 'উশ্রী মিনারেল ওয়াটার'-এর ব্যবসা ভালোই চলছে। রঙ্গিলের বাবা কারখানার মেইন গেটের পাশে একটা ধাবায় নিয়ে এল ওদের। ধাবায় জনা তিনেক লোক খাচ্ছে। তারমধ্যে একজন ওই কারখানারই সিকিউরিটি হবে। বাবা রঙ্গিল আর তিন্নিকে চোখে ইশারা করে সেই লোকের মুখোমুখি গিয়ে বসল। তারপর নিখুঁত ভোজপুরী ভাষায় আলাপচারিতা করতে লাগল। রঙ্গিল আর তিন্নি খানিক দূরে বসে তরকা-রুটি খাচ্ছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ একটা প্রকাণ্ড ধবধবে সাদা গাড়ি এসে দাঁড়াল কারখানার গেটে। আসামাত্র গেট খুলে গেল কারখানার, সেই লোকটিও তড়িঘড়ি ছুটে গেল সেইদিকে। লোকটি উঠে যেতে শতানীক রঙ্গিলদের টেবিলে এসে বলল,"খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, বুঝলি, লোকটার নাম সোমেশ্বর। যশিডিতে বাড়ি। এই কারখানায় কাজ করছে বছর দেড়েক। বলল এই একবছরে কোম্পানির প্রায় ত্রিশগুণ ব্যবসা বেড়েছে।"
–ওই গাড়ি করে কে এল? মালিক?
–শুধু মালিক নয়। এখানকার বিধায়কও বটে। এখানে প্রচুর দাপট। উনি এই কারখানা কেনার পরেই এত উন্নতি। ওনার নাম সংগ্রাম চৌহান।
–বুঝলাম। এবার ঘরে চলো।
রাতে আবার মিনারের আলো জ্বলে উঠল। রঙ্গিল খেয়াল করল, মিনার থেকে আলোটা কোনও কুয়োর উপরেই নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। রঙ্গিল দৌড়ে বাবার কাছে গিয়ে বলল,"বাবা, একবার আমার সঙ্গে যাবে?"
–কোথায়?
–চলো না। হাতে একটা টর্চ আর লাঠি নিও।
বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা। মাফলার, বাঁদরটুপি, সোয়েটার, জ্যাকেট, কোনও কিছুতেই যেন শীত আর বাধা মানছে না। তিন্নি ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘড়ির কাঁটা রাত সাড়ে বারোটা। নিশুতি রাতে বেরিয়ে পড়ল রঙ্গিল আর তার বাবা। তাদের সেই নৈশ অভিযান যেন ছায়ামানবের মতো দেখছিল ঝুঁকে পড়া বেল আর বনশিমুল গাছগুলি। রঙ্গিল মিনারের দিকে চলল প্রথমে। তারপর খানিক গিয়ে থমকে গেল। মিনারের উঠোনে নাসিরভাই হারিকেন জ্বেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। রঙ্গিল এবার মিনারের আলো অনুসরণ করে এগিয়ে গেল। আলোটা দক্ষিণ দিকে কৌণিকভাবে পড়েছে। তার গতিরেখা খানিকটা আড়াল করে দিল মধ্যেকার বাঁশবন। রঙ্গিলরা সাবধানে সেদিকে এগিয়ে গিয়েই থমকে গেল। বাঁশবন পার করে একটা ছোট মাঠ। পাশে নির্জন অন্ধকারে কয়েকটি মাটির বাড়ি যেন ঝিমিয়ে রয়েছে। মাঠের মধ্যিখানে একটি কুয়ো। সেই কুয়ো ঘিরে চার পাঁচটি ছায়ামূর্তি কী যেন করছে। তাদের প্রত্যেকের পিঠে স্কুলব্যাগের মতো কিছু একটা। তার থেকে একটা রড নেমে এসেছে হাতে। সেই রড দিয়ে তারা যেন কুয়োর জলে কী করে চলেছে। মিনারের আলোটা সেখানে এসে মিলিয়ে গেছে। রঙ্গিল বাবাকেও আর এগোতে বারণ করল। কিছুক্ষণ এরকম চলার পর লোকগুলো পাশে দাঁড় করানো বাইক চড়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু মিনারের আলো নিভল না। লোকগুলো চলে গেলে এইবার রঙ্গিল আর তার বাবা কুয়োটার দিকে এগিয়ে গেল। কুয়োর জলে তেলের মতো কী যেন ভাসছে। তার তীব্র গন্ধ!
–বিষ!
রঙ্গিলের কথামতো কাজলমাসি মহেশ্বর চৌবেকে ফোন করেছিল। খবর পেয়েই তড়িঘড়ি তিনি চলে এলেন পরদিন। রঙ্গিল তাঁকে আগের রাতের পুরো ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ বলল। শুনে মহেশ্বর গম্ভীর হয়ে রইলেন। ফোনে ফরেন্সিক টিমকে নির্দেশ দিলেন যাতে গতরাতের ওই কুয়োটা সিল করে ওরা কুয়োর জলের স্যাম্পেল পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেয়। তারপর বামহাতের তালুতে টোকা মেরে বললেন,"কামিনে কো নঙ্গে হাত পকড়্না থা।" রঙ্গিল বলল, "হো সকতা হ্যায়।"
কীভাবে? রঙ্গিল সকলের সামনে মহেশ্বর চৌবেকে বুঝিয়ে বলল, কী করতে হবে। মহেশ্বর শুনে মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেলেন। তবে উঠৈ পড়ার আগে উদ্বিগ্ন চোখে রঙ্গিলের দিকে তাকিয়ে বললেন,"লেকিন খতড়া হ্যায়।"
তিন্নি লাফাতে লাফাতে বলল,"দাদাভাই কিসিসে নেহি ডরতা।"
সময় কেটে গেল উশ্রীনদীর জলের তোড়ের মতোই। সন্ধ্যা হতেই মধপুরের তাপমাত্রা নামতে থাকে হুহু করে। কথামত রাত দশটা বাজতেই শাল মুড়ি দিয়ে মহেশ্বর চৌবে চলে এলেন দুর্গামন্দিরের কাছে। রঙ্গিল, বাবা আর তিন্নি সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। মহেশ্বরের হাতে রয়েছে ওয়াকিটকি। বোঝা যাচ্ছিল সে সবসময় কারো সঙ্গে কথা বলে চলেছে। রাত আরও গাঢ় হল। সাড়ে এগারোটা বাজতেই রঙ্গিলরা সবাই চলল মিনারের দিকে। একটা বুনোগাছের ঝোপের আড়াল থেকে তারা দেখল নাসিরভাই রাতে শুয়ে পড়ার তোড়জোর করছে। রঙ্গিলরা ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করতে থাকল। মিনারের চত্বরে নিশুতি নেমে এসেছে। নাসিরভাই হারিকেন জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে চাদরমুড়ি দিয়ে।
রাত তখন সাড়ে বারোটা। একটা ছোট্ট ফ্রকপরা মেয়ের ছায়ামূর্তি মিনারে প্রবেশ করল। মহেশ্বর তৎপর হয়ে সেদিকে যেতে চাইছিল। রঙ্গিল বারণ করল। খানিক অপেক্ষার পর মিনারে আলো জ্বলে উঠল। সেই আলোর গতিপথ দেখে রঙ্গিল এবার ইশারা করল তাকে অনুসরণ করতে। আলোর পথ 'একটা বাগানবাড়ির দিকে নির্দেশ করছে। সেই চোরাপথে হাঁটতে হাঁটতে সকলেই হতবাক। এ আলো তো রঙ্গিলের কাজলমাসির পাশের বাড়ির কুয়োতে এসে পড়েছে! এই কুয়ো ব্যবহার করে মাসির বাড়ির সেই পটুয়ার পরিবারটি। খুব সন্তর্পণে তারা সেই কুয়োটির কাছে এসে একটি ভাঙা দেয়ালের আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগল। কুয়োটা ঘিরে রয়েছে চারটি ছায়ামূর্তি। ঠিক আগের রাতের মতোই। তাদের প্রত্যেকের পিঠে স্কুলব্যাগের মতো ব্যাগ। বুঝতে বাকি রইল না, এবারও তারা ওই কুয়োর জলে বিষ মেশাচ্ছে। মহেশ্বর চৌবে ওয়াকিটকিতে কী সব বলল ফিসফিস করে। তারপর হঠাৎ বাঁশি বাজাতে শুরু করল। বাঁশির আওয়াজে সেই চারজন ছায়ামূর্তি সতর্ক হয়ে পালাবার চেষ্টা করতে না করতেই তাদের ঘিরে ফেলল একদল পুলিশ। মহেশ্বর এতক্ষণ তাঁর পুলিশটিমকেই লোকেশন দিয়ে যাচ্ছিল। যাবার আগে রঙ্গিলকে বলল,"কাল মিলেঙ্গে। থ্যাঙ্কস।”
পরদিন ঘরে ফেরার পালা। দুপুর দুপুর বের হলে রাতের ভিতর কলকাতা পৌছনো যাবে। বাবা, মা, রঙ্গিল, তিন্নি সবাই তৈরি। পটুয়াকাকু খুশি হয়ে একটা ছোট্ট সরস্বতী মূর্তি দিয়েছে তাদের। এমন সময় মহেশ্বর চৌবে এসে হাজির। হাতে এক বাক্স ছানার মুড়কি। হেসে বলল, "লিজিয়ে। ইঁহাকা ইয়ে মিঠাই ওয়ার্ল্ড ফেমাস হ্যায়।" সকলেরই মন কৌতূহলী। তবে কি রহস্যভেদ হলো? চৌবে সব বুঝিয়ে বলল। কাল রাতে পাকড়াও করা চারজন তাদের দোষ স্বীকার করেছে। চারজনই 'উশ্রী মিনারেল ওয়াটার'-এর কারখানার লোক। ওদের জেরা করে পুলিশ ওই মিনারেল ওয়াটারের কারখানা সিল করে দিয়েছে। ওই কারখানার পিছনে অনেক বড় বড় মাথা আছে, চৌবে জানে। জেনেশুনেও সে তাঁর কর্তব্যে অনড়। আসলে হয়েছে কী, মধুপুরের জল স্বাস্থ্যকর একথা সর্বজনবিদিত। তাই এখানে মিনারেল ওয়াটারের ব্যবসা ফাঁদতে গেলে অভিনব কিছু একটা ভাবতেই হতো। সেইমতো কারখানার মালিক ফেঁদে বসলেন নতুন ফন্দি। এক এক করে রাতের অন্ধকারে মধুপুরের কুয়োগুলোতে বিষ মেশানো শুরু হল। গ্রামকে গ্রাম লোক অসুখে পড়ছিল। তবু কুছ পরোয়া নেই। ব্যবসা তো বেশ চলছে। আপাতত মহেশ্বর সেই রহস্য সমাধান করায় সবাই তাকে সাধুবাদ দিচ্ছে।
রঙ্গিল জিজ্ঞেস করল,"আর ফরেন্সিক রিপোর্ট এসেছে কাকু?"
মহেশ্বর হেসে জানাল, এসেছে রিপোর্ট। কুয়োর জলের বিষ আর লোকগুলোর ব্যাগের বোতল থেকে পাওয়া বিষ এক। ট্রাইহ্যালোথেন, হ্যালোঅ্যাসেটিক অ্যাসিড আর নাইট্রোস্যামিন। বাবা উৎসাহী হয়ে বলল,"এগুলো সবই তো মিনারেল ওয়াটার তৈরির বর্জ্যপদার্থ! ভাবো। একে কয় মাছের তেলে মাছ ভাজা।" ফিরে যাবার সময় মহেশ্বর রঙ্গিলকে বলে গেল, “আপ অউর উস মিনারওয়ালি ভূত পুরা মধুপুরকো বাঁচা লিয়া। আপকো বহুত শুকরিয়া, ছোটা জিনিয়াস।”
সব তো হলো। এদিকে তিন্নির মন থেকে প্রশ্ন যায় না। "তাহলে যে দাদাভাই, তুমি বলেছিলে ভূত বলে কিছু হয় না। হয় তো। ওই যে মিনারের ভূত।"
রঙ্গিল কিছু বলল না। মনে মনে হাসল শুধু। এদিকে গাড়ি নিয়ে বেরোবার মুখে পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়ল বুধোয়া আর তার বোন লছমি। তাদের পিছুপিছু তাদের গ্রামবাসীরাও এসেছে রঙ্গিলদের ধন্যবাদ জানাবে বলে। ফলে গাড়ি থেকে সকলকে নামতে হল। লছমি তিন্নির জন্য একটা পাথরের মালা বানিয়েছে। সেটা পেয়ে তিন্নি খুশিতে আটখানা। বুধোয়ার হাত ধরে রঙ্গিল বলল,"মা ক্যায়সা হ্যায়।" বুধোয়া মাথা নেড়ে জানাল যে ভালো আছে। এবার লছমির কাছে গিয়ে রঙ্গিল বলল, "আপকা কুছ খো গ্যয়া হ্যায়?"
লছমি ব্যাজার মুখ করে 'হ্যাঁ' বলতেই রঙ্গিল তার পকেট থেকে সেই মিনার থেকে পাওয়া নূপুরটা ওর হাতে তুলে দিল। সকলে অবাক হয়ে দেখল, সত্যিই তো। লছমির এক পায়ে নূপুর আছে, অন্য পায়ে নেই! লছমি খুশি হয়ে নূপুরটা অন্য পায়ে পরে নিয়ে বলল,"শুকরিয়া ভাইয়া।"
অনেকক্ষণ গাড়িতে কেউ কোনও কথা বলল না। গাড়ি দুমকার পথ ধরেছে। হঠাৎ বাবা বলল,"কী করে বুঝলি, ওই নূপুরটা লছমির?" রঙ্গিল হেসে বলল,"প্রথম যেদিন দেখেছিলাম লছমিকে, সেদিনই ওর ভিতর একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্য দেখেছিলাম। ওর চালনচলন ওই মিনারের ছায়ামূর্তির চালনচলনের সঙ্গে একেবারেই এক। তারপর আজ দেখলাম ওর অন্য পায়ের নূপুরের নকশা অবিকল আমাদের মিনারে পাওয়া নূপুরের মতো!"
তিন্নি আবার উৎসাহী হয়ে বলল, “তাহলে দা’ভাই, লছমিই মিনারের ভূত?”
মা বলল, “বলতেই হবে মেয়েটার সাহস আছে।”
রঙ্গিল বলল, “আসলে আমাদের স্কুলে পড়িয়েছে, কোণঠাসা বিড়াল সবচেয়ে বেশি সাহসী হয়। লছমির গ্রামের মানুষ বিষাক্ত কুয়োর জল খেয়ে অসুস্থ হচ্ছিল। তার মাও তো হাসপাতালে ভর্তি হলো। আমার ধারণা, ও নিজের চোখে ওই লোকগুলোকে বিষ মেশাতে দেখেছিল। তাই ও সকলকে সতর্ক করতে ওই অভিনব পন্থা নিয়েছিল। ও নিশ্চিত জানত কেউ না কেউ ওর সংকেতে সাড়া দেবেই।”
তিন্নি খিলখিল করে হেসে বলল, “তাহলে দা’ভাই, তুমি ঠিক বলেছিলে?”
–কী
–ভূত বলে সত্যিই কিছু হয় না।
পাঠকদের মন্তব্য
250