চাঁদের মেয়ে
সঞ্জিতকুমার সাহা
রূপু তো কলকাতার পুজো ছেড়ে আসতেই চায়নি। কলকাতার পুজোয় কত মজা। ওদের পাড়ার পার্কে যে পুজো হয় তার তো কত নাম-ডাক। কত কত লোক কত কত দূর থেকে আসে ওদের পাড়ার ঠাকুর দেখতে। তাছাড়া পার্ক জুড়ে বসে কত কত দোকান। আলুকাবলি থেকে মশলামুড়ি, নাগরদোলা থেকে বাতাস-বেলুন, বেবলেট থেকে রকেট, জয়রাইড থেকে জাম্পিং মিকিমাউস সহ আরো কত কী! এসব ছেড়ে কারুর এই সময়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে ? না ভালো লাগে!
পঞ্চম রূপুর বেস্ট ফ্রেন্ড, একই সঙ্গে একই স্কুলে এক ক্লাসে পড়ে। পুজোর কটা দিন তো ওরা ওদের পাড়ার পার্কেই সময় কাটাবে বলে ঠিক করেছিল। রূপু থাকবে না শুনে ওরও মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বলছিল, বল না মাকে তোর বাবাকে বুঝিয়ে বলবে, তুই বলবি অন্য সময়ে যাব। সেজন্য রূপু মায়ের কাছে বায়নাও ধরেছিল সে পুজোর সময়ে যাবে না, পার্কের পুজো ছেড়ে কোত্থাও যেতে চায় না। কিন্তু বাবা সবাইকে সঙ্গে নিয়েই যাবেন। মা-ও না বলতে পারছেন না। কারণ বেশ কিছুদিন ধরে দাদাইয়ের শরীর খারাপ যাচ্ছে। দাদাই মানে ঠাকুরদা, ঠাকুরদাকে দেখতে যেতে হবে। এদিকে রূপুর বাবাও এ-সময়ে ছাড়া ছুটি পাচ্ছেন না। ইদানিং তাঁকে প্রায়ই ওড়িষা যেতে হয়। ওড়িষার মালকানগিরিতে একটা কী প্রোজেক্টের কাজ চলছে, সেটা দেখভাল করতে তাঁকে সেখানে মাঝেমধ্যেই যেতে হয়। তাই রূপুর বাবা বলতে গেলে কলকাতায় এখন থাকতেই পারেন না। তাই মা-কে ধরেও রূপুর বিশেষ কোনো লাভ হলো না।
অতএব মা-বাবার হাত ধরে রূপুকে ট্রেনে উঠতেই হয়েছে। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই ট্রেন এসে থামল বাঁকুড়া স্টেশনে। বাবার হাত ধরে ট্রেন থেকে নেমে এই স্টেশনটাকে রূপুর কিছুতেই পছন্দ হলো না। কেমন ম্যাড়মেড়ে ঝাপসা হলদেটে আলো। লোকজনের তেমন ওঠানামা নেই, চিৎকার চেঁচামেচিও নেই। সামান্য দু-একজন উঠল কি উঠল না, তবে নামল বেশ কিছু জন। তার মধ্যে রূপুরাও আছে। ওভারব্রিজ টপকে স্টেশনের বাইরে বের হয়ে আসতেই কিছু রিক্সা, টোটো, অটো ও প্রাইভেট ট্যাক্সির হল্লা-চিৎকার শুরু হয়ে গেল–এদিকে আসেন, এদিকে আসেন।
দেখতে দেখতে বেশ কয়েকজন রূপুদের ঘিরে ফেলল, মুকুটমনিপুর মুকুটমনিপুর…!
কেউ কেউ বলতে থাকল, ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি…!
কেউ কেউ সরাসরি প্রশ্ন করে জানতে চাইল, কোথায় যাইব্যেন বাবু?
বাবা বললেন, রানিবাঁধ।
এবারে হুড়োহুড়ি বেধে গেল ট্যাক্সি-চালকদের মধ্যে, রূপুদের কে নিয়ে যাবে, এই নিয়ে।
বাবা একজনের সঙ্গে রফা করতে, অন্যরা মুখ ছোটো করে ভিড় আলগা করে দিলো। রূপুরা রানিবাঁধ যেতে থাকল।
গাড়িটা শহরের ভেতর দিয়ে না গিয়ে, শহরের পাশ ঘেঁষে ভৈরবস্থান ছুঁয়ে, লোকপুর হয়ে, গোবিন্দপুর-রাজগ্রামের ব্রিজ পেরিয়ে সরু একটা পিচ রাস্তা ধরে পাঁই পাঁই করে ছুটতে লাগল। এদিকে মা অত চেনেন না, বাবার ছেলেবেলা কেটেছে এদিকেই। সুতরাং যেতে যেতে তিনি একেকটা জায়গা দেখিয়ে বলতে থাকলেন, এটা ইন্দপুর, এটা ডাঙ্গারামপুর, এটা হাতিরামপুর, এদিক দিয়ে সোজা পুবদিকের রাস্তাটা চলে গেছে রাইপুর, ওদিকে চলে গেছে খাতরা। বাবা বলেই চলেছেন। মা মুগ্ধ হয়ে সেসব শুনছেনও। মায়ের বাড়ি কলকাতাতেই, গড়িয়ায়। তার আগে নাকি দাদাই ও দিদারা রাজশাহী না পাবনা কোথাও ছিলেন। সেসব কোথায় রূপু জানে না। তবে, এটুকু মায়ের মুখ থেকে শুনেছে যে সেটা বাংলাদেশ। মানে ভিন্ন দেশ। সেখানে যেতে পাসপোর্ট-ভিসা লাগে। রূপুর ওসব নেই, মা-ও কখনো সেখানে যাওয়ার কথা বলে না। কারণ তার মা-বাবা তো থাকেন গড়িয়া কলেজের পাশেই নিজেদের বাড়িতে।
এদিকে বাবার দেশের বাড়ি বাঁকুড়ার রানিবাঁধে। সুতরাং তাঁকে মাঝেমধ্যে এক-দুদিনের জন্য হলেও এখানে যেতে-আসতে হয়। রূপু অবশ্য এর আগে কখনো রানিবাঁধে আসেনি। কারণ ঠাকুরদা ও ঠাকুরমা তো কলকাতায়, ওদের সল্টলেকের বাসায় মাঝেমাঝেই আসেন, থাকেনও। দাদাই এবং ঠাম্মি এলে তো রূপুর তখন ভারী আনন্দ। দাদাইকে নিয়ে তখন রোজ বিকালে পার্কে যেতে হয়। পার্কের বেঞ্চে বসে দাদাই তখন কত কত গল্প বলেন। ময়না পাখির গল্প বলেন, খ্যাংরাকাঠি তালগাছের ডালে ঝুলে থাকা উল্টো কুঁজোর মতো বাবুই পাখির বাসার গল্প বলেন, হাতির গল্প বলেন। রানিবাঁধের দিকে অনেক হাতি আছে। ওরা নাকি দিনের বেলায় বনেজঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে থাকে। তারপর রাত নামলেই দল বেঁধে চাষীর ক্ষেতে নেমে আসে মকাই খেতে, জমির ধান খেতে। এসব গল্প শুনতে রূপুর খুব ভালো লাগে। ইচ্ছেও করে হাতিদের দেখতে। সেজন্য দাদাইদের রানিবাঁধে যেতেও ইচ্ছে করে। কিন্তু তা বলে পুজোর সময়ে!
রানিবাঁধে আসার আগে বাবা বললেন, চলো তোমাদের মুকুটমণিপুর ঘুরিয়ে নিয়ে যাই। মা তো খুব খুশি। সুতরাং গাড়ি ছুটল দেদার ব্রিজের পাশ দিয়ে ছোট্ট পাহাড়ি-টিলার পাকদন্ডী রাস্তা বেয়ে মুকুটমণিপুর। এবারে ভালো লাগতে লাগল রূপুর। এদিকে পুজো-টুজো হয় কিনা বোঝা যাচ্ছে না। কোথাও তো প্যান্ডেল-ট্যান্ডেল কিছু চোখে পড়েনি। বাবা হয়তো রূপুর মনের কথা বুঝতে পেরেছেন। তিনি বললেন, দুর্গাপুজোর জাঁকজমক আসলে শহরের পুজোয় হয়। এদিকের গ্রামে তত হয় না। তবে এদিকে কালীপুজোর খুব রেওয়াজ আছে। যাই হোক, রূপুর এবারে জায়গাটা ভালো লাগতে লাগল। চড়াই পথের দুপাশেই গাছগাছালি, ফুরফুরে হাওয়া বেশ ভালো লাগছে। তাতে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। মা বললেন, জানলার কাঁচটা তুলে দে।
মুকুটমণিপুরে গিয়ে সত্যি রূপুর ভালো লেগে গেল। পাহাড়-টিলার নিচে মস্ত জলাধার। ছোট্ট একটা নৌকাও দুলছে সেখানে। রূপু চারদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল, এত সবুজ এখানে! আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, এখানে আলো মাখা হাওয়া এবং নীল আকাশ সব মাখামাখি হয়ে আছে, এরা স্বপ্ন দেখায়। কত কত অনুভূতি জন্ম নিতে থাকে মনের ভিতরে। আকাশের দিকে তাকালেই মনে হয় রূপু এখনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দেবে। এরকম নীল ঝকঝকে আকাশ তো কলকাতায় দেখা যায় না। সত্যিই অপূর্ব। দেখতে দেখতে রানিবাঁধ এসে গেল। রানিবাঁধে ঢোকার মুখে, হাতের ডানদিকে একটা খাড়াই বন দেখিয়ে বাবা বললেন, ওখানে একটা বনবাংলো আছে। একেবারে একটা পাহাড়ের চূড়োয়। বর্ষাকালে ওখান থেকে প্রকৃতিকে যা দেখায় ভাবা যায় না। বাবার মনের ভিতরে হয়তো শৈশব উঁকি মেরে চলেছে। বাবা হয়তো ওই বাংলোয় সেই বয়সে বহুবার গিয়েছেন। গিয়েছেন শুধু বর্ষার রূপ দেখতে। তাঁর এই অনুভব বা শৈশব-স্মৃতি হয়তো রূপু এবং ওর মাকেও ছুঁয়ে দেখাতে চান। তাই তিনি ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, একবার তোমাদের নিয়ে আসব।
এরপর তো দাদাই যেখানে থাকেন, রানিবাঁধের একদম শেষ সীমানায়, সেখানে আসা গেল। এখানে বারান্দায় বসে পুবদিকে তাকালে খাড়াই একটা পাহাড়, সেখানে শালজঙ্গল, ডান দিকে ছোটোখাটো ঢেউ খেলানো পাহাড় আর জঙ্গল। ওদিকে কেউ থাকে না, কেউ যায়ও না। কারণ ওই পাহাড়ের জঙ্গলে নাকি হাতির দল দিনের বেলায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। রূপু সেদিকে তাকিয়ে ভাবলো, অদ্ভুত সুন্দর এই জায়গাটা। সে দেখতেই লাগল। রূপুর মনে হতে লাগল, এখানে পঞ্চম এলে, ওরও ভালো লাগত। এখানে যে কোনো বয়সের, যে কোনো মানুষের ভালো লাগবেই। অদ্ভুত নির্জনতা এখানে, এই বাড়িটিকে ঘিরে, চারিদিকে।
সকালের প্রাতরাশ হয়ে গেলে, দাদাইয়ের হাত ধরে রূপু ঘুরতে বের হল। রূপু তো এখানে কিছু চেনে না, তাই দাদাই এক এক করে বলে যেতে লাগলেন, এই রাস্তাটা বরাবর চলে গেছে ঝিলিমিলি হয়ে, বান্দোয়ান হয়ে জামশেদপুর। এই রাস্তাটা চলে গেছে…! রূপু তাকিয়ে দেখতে লাগল আকাশটাকে, আকাশ চুঁইয়ে পড়া রোদের আলোকে। এমন ঝকঝকে রোদ আগে কখনো সে দেখেইনি। কলকাতায় এসব দেখা যায় না। ওখানে আকাশটা কেমন ঘোলাটে, ধোঁয়া-ধুলোর আস্তরণে সব সময়ে মুখ ঢেকে রাখে। এখানে সেসব নেই। সেজন্যই বোধহয় দাদাই এখানেই থাকতে চান। কিছুতেই কলকাতায় পাকাপাকিভাবে থাকতে চান না। আর গেলেও বেশিদিন থাকতে পারেন না, হাঁপিয়ে ওঠেন।
দাদাইয়ের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে রূপু দেখতে থাকল, আমগাছ-জামগাছ, একটা কামিনী ফুলের গাছ, কাঁঠাল গাছ, বট-পাকুড়ের গাছ। এছাড়া আরো অনেক অনেক গাছ–যা রূপু নিজে চেনে না। তবে এখানকার গাছের চেহারাগুলো কিন্তু অন্যরকম। রাস্তার দুধারে জংলা গাছে ফুটে রয়েছে বোতামের মতো নানা রঙের ফুল। দাদাই বললেন, এগুলোকে এখানে সবাই কুটুস বলে। রূপু হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করল, জায়গাটা অদ্ভুত শান্ত, কেবল মাঝেমধ্যে পাখির ডাক শোনা যায়। এরই মধ্যে সে দেখল ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়াপাখির দল বেঁধে উড়ে চলা। রূপু এমন গাঢ় সবুজ রঙের এতগুলো টিয়াকে একসঙ্গে আগে কখনো দেখেইনি। অবাক হয়ে দেখতে থাকল টিয়াপাখির আকাশপথে উড়ে চলা। কোথা থেকে কোথায় চলেছে কে জানে! রূপু দেখল বুলবুলি, টুনটুনি, দোয়েল, শালিখও। দাদাই বলেলেন, আমাদের বাড়ির এককোণে পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মস্ত বড় যে তেজপাতার গাছটা আছে। সেখানে এরকম অনেক পাখি আছে। ওরা এখন নেই, তবে গোধূলির সময় হলে ওরা আবার গাছে ফিরে আসে। তখন দেখতে পাবি। আর তখন যদি ওদের চেঁচামেচি শুনিস!
এরপরে ঘরে ফেরা, দুপুরে খাওয়াদাওয়া, তারপরে ঘুমিয়ে পড়া। রূপুর যখন ঘুম ভাঙল তখন একেবারে শেষ বিকেল। তখনো বোধহয় সূর্যদেব পাটে বসেননি, পশ্চিম দিকে একটা পাহাড়ের খাঁজে ডিমের কুসুমের মতো তিনি আলো ছড়িয়ে আছেন। এত সুন্দর দেখাচ্ছে, রূপু ভাবতে পারে না। এরপরে রূপু একাই ঠাকুরদার বাড়ির চৌহদ্দিটা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকল। আরিব্বাস দাদাইয়ের তো এখানে মস্ত বাগান রয়েছে। মেলা শাকসবজি সেখানে। বেগুন, লাউ, সিম, কুঁদরি, লংকা, মুলো, কড়াইশুটি, লাল শাক, ধনেপাতা আরো কত কি! পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে স্থলপদ্ম ও কনকচাঁপার গাছ। রূপু এভাবে আগে কখনো সবজির গাছ, ফুলের গাছ দেখেনি। তাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকল এসব। এমন সময়ে ঠাকুরদা এলেন সেখানে, বললেন, দাদুভাই এসব আমার নিজের হাতে লাগানো। মাটি নিজের হাতে বানানো, সার নিজের হাতে তৈরি। এসবের সোয়াদই আলাদা। আজ যে লাউয়ের তরকারি খেলে, তাও আমার এই বাগানের। চেষ্টা করি আমার নিজের হাতে লাগানো জিনিস খেতে।
এরপরে একটু একটু করে আলো কমে এল, কেমন আবছা অন্ধকার নেমে এল সবখানটায়। ডানদিকের পাহাড়-জঙ্গল ঢেকে গেল অন্ধকারে। সামনের শালবনটাও অস্পষ্ট হতে থাকল। আর ঠিক এই সময়ে রূপুর মনে হতে লাগল, ওদের পার্কের পুজোর কথা। প্যান্ডেলের কথা। পঞ্চমের কথা। সেই কবে থেকে পার্কে গাড়ি গাড়ি বাঁশ-কাঠ পড়তে শুরু করেছে। আজ সন্ধের মধ্যে ঠাকুরও এসে যাবে। কত হৈ চৈ হচ্ছে সেখানে। রূপু ওখানে থাকলে সেও ছুটে ছুটে যেত সেখানে। ওদের বাড়িটা পার্কের পাশেই। পুজোর কদিন আলোয় আলোময় হয়ে থাকে পার্কটা। রূপুর তো খুব ভালো লাগে। আর এখানে! ঝুপ করে কেমন আঁধার নেমে এলো।
কিন্তু না, কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার সরে গিয়ে আকাশে এক রকমের আলো ভেসে উঠতে লাগল। আকাশে তারা নক্ষত্র ফুটে উঠতে লাগল। এ এক অন্যরকম আলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল রূপু। রূপুর মা-ও বাড়ির আঙিনায় একটা চেয়ার পেতে আকাশ দেখতে থাকলেন। এমন ঝকঝকে রাতের আকাশ কলকাতায় তো দেখা যায় না। রূপু এর আগে এমন আকাশ দেখেইনি।
এসব দেখতে দেখতে রূপুর কেমন যেন ঝিমুনি আসতে লাগল। গতরাতেও ঠিকমতো ঘুম হয়নি, ট্রেনের গগনভেদী চিৎকার, হুইসেল ও ঝমঝম আওয়াজে কারুর ঘুম হয় নাকি! দুপুরেও আলগা জায়গা বলে ভালো ঘুম হয়নি।
রূপুর ঝিমুনি লক্ষ্য করে মা বললেন, এই তোর ঘুম পেয়েছে, ঘরে যা।
রূপু অমনি চোখ কচলে বলল, না না ঘুম পায়নি। আসলে এমন সুন্দর একটা জায়গায় মা, দাদাই, ঠাম্মি সবাই চেয়ার পেতে বসে আকাশ দেখবে, গল্প করবে আর তাঁদের ছেড়ে একা ঘরে গিয়ে বিছানায় শোবে! রূপু তাই কিছুতেই গেল না। বরং মায়ের গায়ের দিকে আরও খানিকটা চেয়ার টেনে নিল। চেয়ারে বসে বসেই আকাশ দেখতে থাকল।
ভেসে আসতে লাগল মায়ের গলা, ওটা কি শুকতারা! সপ্তর্ষিটা কোন্ দিকে ওঠে?
এসব শুনতে শুনতেই রূপুর মনে হতে লাগল, একটা কেউ যেন আকাশ থেকে নেমে সোজা ওদের এই আঙিনার দিকেই এগিয়ে আসছে।
রূপু দেখল, ফুটফুটে একটা ছোট্ট মেয়ে অনেকটা ডলপুতুলের মতো দেখতে। আকাশ থেকে নেমে সোজা ওদের আঙিনার দিকে এসে রূপুর দিকে পিটপিট কার তাকিয়ে বলল, আমাকে চিনতে পারছ?
না। মাথা ঝাঁকিয়ে রূপু বলল, না, তুমি কে? আগে তো তোমাকে দেখিনি।
সে বলল, আমি চাঁদের মেয়ে।
চাঁদ! রূপু খানিক অবাক হয়, চাঁদে আবার কেউ থাকে নাকি! তারপর কিছুটা ভেবে বলল, চাঁদে তো একটা বুড়ি থাকে। সে চরকা কাটে।
ঠিকই তো, তোমরা যাতে চরকা কাটা বুড়ি বলো, সে তো আমার দিদা। আর চাঁদ হল আমার মা।
এসব শুনে রূপু কিছুটা অবাকও হয়। আবার ভালোও লাগে। মনে মনে ভাবল, হলেও হতে পারে।
ঠিক এমন সময়ে ছোট্ট ডলপুতুলের মতো মেয়েটি বলল, যাবে?
কোথায়?
আমার সঙ্গে। আমি যেখানে থাকি সেখানে।
সেটা কোথায়? কোথায় থাকো ? রূপু বলতে থাকল, আমি তো এদিকে বিশেষ চিনি না।
মেয়েটি বলল, তোমাকে চিনতে হবে নাI আমি তো চিনি। এসো আমার সঙ্গে। বলে মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিলো–আমার হাত ধরো।
মেয়েটির অনুনয়ে কিছুতেই না বলতে পারল না। হয়তো কিছু না ভেবেও রূপু মেয়েটির হাত ধরল।
আর অমনি মেয়েটি রূপুর হাত ধরে হেঁইঁয়ো বলে একটা লম্বা উড়ান দিলো।
উড়তে উড়তে ওরা একেবারে আকাশে, মনে হয় চাঁদের কাছাকাছি চলে গিয়েছে। রূপু অবাক হয়ে দেখল, আকাশে কেমন গোল হয়ে মস্ত থালার মতো ফুটে রয়েছে চাঁদ আর তার গা থেকে আলো বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চরাচরের সবখানে। এই তো রূপু স্পষ্ট দেখতে পেল ওদের পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে একটা সরু ঝরনা, পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে দৌড়ে ছুটে চলেছে জল, পাহাড়ের চুড়োয় মাখামাখি হয়ে আছে আলো, সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা আলো ছুইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে গাছের ডালে, পাতায়। তারপর ধানক্ষেতে সবুজ ধানের শিষ ছুঁইয়ে আলো মাখিয়ে দিচ্ছে তাদের গায়ে। আর অমনি ধান ফুলের গন্ধ রূপুর নাকে এসে জড়িয়ে ধরল। রূপু দিল একটা রাম হ্যাঁচ্চো…!
সঙ্গে সঙ্গেই রূপুর মা বললেন, চলো চলো ঘরে চলো, ঢের হয়েছে উঠোনে বসে আকাশ দেখা। এখানে এখন হিম পড়া শুরু হয়ে গেছে। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে।
মায়ের কথা কানে গেল কি গেল না, রূপু চোখ কচলে বলে উঠল, আমি তাহলে আকাশ দেখতে দেখতে কোথায় চলে গিয়েছিলাম? তাহলে ওই ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটা কে, যে তাকে হাত ধরে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল? ও কি সত্যি সত্যি মেয়ে? আকাশে থাকে? পাখির মতো ভাসতে পারে? আকাশেই কি ওরা থাকে? ওখানেই কী ওর ঘরবাড়ি? আচ্ছা পাখি হলে তো ডানা থাকে, পাখিরা তো ডানা মেলে আকাশে ওড়ে। কিন্তু ওর তো ডানা ছিল না। ও তো রূপুর হাত ধরেই উড়েছিল। ও কি সত্যিই কেউ? মেয়ে? চাঁদের মেয়ে? চাঁদ কি সত্যি কেউ হয় ওর? না কি এক টুকরো মেঘ? মেঘ হয়ে নেমে এসেছিল ওর কাছে? এখানে তো টুকরো টুকরো মেঘও অনেক সময়েই আকাশ থেকে নেমে আসে। ও কি সেরকম কেউ? কে জানে ? রূপু নিমেষে ভুলে গেল ও এখানে খোলা আকাশের নিচে সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছিল কি না! অথবা ওর পার্কের পুজোর কথা। প্যান্ডেলের কথা। পঞ্চমের কথা। বরং উল্টে এই জায়গাটাকেই ভালো লাগতে লাগল। এখানে না এলে কি এমন আকাশ আর চাঁদ সে দেখতে পেত? চাঁদের মেয়ের হাত ধরে সে উড়তে পেত? পঞ্চম তো শত তপস্যা করেও কলকাতায় এমন অপরাপ চাঁদ, আকাশ ও চাঁদের মেয়ে দেখতে পারে না, কোনোদিনই সে দেখতে পাবে না। এটা মনে হতেই মনে মনে সে বাবাকেও ধন্যবাদ দিলো।
পাঠকদের মন্তব্য
250