ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্পগাথা / সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেয়াল

 

দশ বছরের মেয়ে শিখি কোনোদিন সামনে থেকে শেয়াল দেখেনি। কেবল শেয়ালের ছবি দেখেছে। আর দেখেছে কালী ঠাকুরের হাতে ধরা কাটা মুন্ডুর তলায় জিভ বার করে দাঁড়িয়ে থাকা শেয়ালের মূর্তি। যদিও বাবার কাছে বায়না করলে খেলনা শেয়াল পেতেই পারে। কিন্তু জ্যান্ত শেয়ালের সঙ্গে দেখা করাতে পারবে না বলেই মনে হয়। আর শহুরে আটতলা আবাসনে বসে কুকুর-বেড়াল ছাড়া কে’ই বা কবে শেয়াল দেখেছে? শিখি অনেকের মুখেই শুনেছে, শেয়াল নাকি খুব চালাক হয়। বিভিন্ন গল্প পড়তে গিয়ে তাদের চালাকির পরিচয় পেয়েছে। তবে, যে কারণে তার সামনাসামনি শেয়াল দর্শনের ইচ্ছে, সেটা কেবল তার ঠাকুমার মুখে শেয়ালদের সম্পর্কে নানানরকম মজার মজার গল্প শুনে।

 

শিখির বাবা-মা দুজনেই চাকরি করে। শিখির সঙ্গে কাটানোর মত তাদের হাতে সময় খুব অল্পই থাকে। সন্ধের পর বাড়ি ফিরে তাকে নিয়ে পড়াতে বসে তার বাবা। মা চলে যায় রান্নাঘরে। পড়া শেষ করার পর বাবার ইচ্ছে হলে কোনো-কোনোদিন শিখিকে নানান রকমের গল্প শোনায়। তবে শিখিকে গল্প শোনানোর আসল মানুষটা থাকে তাদের গ্রামের বাড়িতে। ছুটিছাটায় তারা যখন তিনজনে মিলে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকে, তখন তার ঠাকুমার গল্পের ঝুড়ি থেকে অনেক গল্প বেরিয়ে আসে। বেশিরভাগ গল্পের মধ্যেই শেয়ালদের উপস্থিতি থাকায় তাদেরকে শিখির ভালোবাসার জগতের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে কোনো অসুবিধা হয়নি। আসলে শেয়ালেরা ছিল গ্রামের বাড়ির মানুষদের নিকটতম প্রতিবেশী।

 

শিখিদের গ্রামের মাটির বাড়িটার ঠিক পিছনেই অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল এক বিরাট বাঁশবন। আর সেই বাঁশবনের ভেতরেই ছিল শেয়ালদের বসবাস। তাদের বাড়ি আর  সেই বাঁশবনের মাঝে ছিল একটা মাঠ। শিখিদের বাড়ি থেকে মাঠে যেতে হলে খালের মতো দেখতে একটা সরু নয়ানজুলি টপকাতে হতো। সে দাদুর মুখে শুনেছে ওটা আসলে বাড়ি আর মাঠের সীমানা রক্ষা করার জন্য কাটা হয়েছিল। নয়ানজুলির ওপর একটা সিমেন্টের স্ল্যাভ পাতা ছিল বাড়ি আর মাঠের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে। শিখির সেটাকে প্রথম দেখার পর মনে হয়েছিল একটা ছোট্ট নদীর ওপর ছোট্ট সেতু। সেই সেতু টপকে সকালের দিকে বাঁশ পুঁতে দড়ি টাঙিয়ে জামাকাপড় মেলা হত, আর রোদ পড়লে দড়ি সমেত তুলে আনা হতো। কখনও শাড়িতে মাড় দিয়ে মাঠের যে অংশে ঘাস থাকত তার ওপর টানটান করে মেলে দিত বাড়ির মেয়েরা। এছাড়া শীতকালে মাদুর পেতে লেপ-কম্বল মেলে গরম করে নেওয়াটাও ছিল দাদু-ঠাকুমার একটা বড় কাজ। শীত-গীষ্ম-বর্ষা বারোমাস বিকেলবেলা ছেলেমেয়েরা খেলত সেই মাঠে।  গ্রীষ্মে ফুটবল, শীতে ক্রিকেট ছাড়াও গোজে, বউবাসন্তী, এক্কাদোক্কা খেলা হতো। অনেকে আবার ঘুড়িও ওড়াত।

 

মাঠের এক ধারে একটা বিশাল আম আর দুটো কাঁঠাল গাছ ছিল। গ্রীষ্মে যখন সেই গাছের ফলগুলো পাকত, গ্রামের ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি শেয়ালেরাও সেই ফল খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতো না। তবে শেয়ালদের পাকা কাঁঠাল খাওয়ার জন্য বেশিরভাগ সময়ই ছেলেমেয়েদের ওপরেই নির্ভর করতে হতো। কারণ, শেয়ালেরা গাছে চড়তে পারে না। ছেলেমেয়েরা যখন পুরুষ্টু কাঁঠাল পেড়ে গর্ত খুঁড়ে পাকার জন্য মাটি চাপা দিয়ে রাখত, তখনই গন্ধ শুঁকে শেয়ালেরা হানা দিত সেই গর্তে। কখনও অর্ধেক আবার কখনও পুরোটাই খেয়ে চলে যেত। মাঝেমধ্যে অবশ্য সেটুকু পরিশ্রমও তাদের করতে হতো না। উঁচুডালের কাঁঠাল আপনা-আপনিই পেকে পড়ত গাছের নিচে মাটির ওপরে। আর তারা আনন্দ করে গাছপাকা কাঁঠালের স্বাদ জমিয়ে উপভোগ করত। দানা সমেত খেয়ে চলে যেত।

 

সূর্য পাটে বসলেই সেই মাঠটা চলে যেত শেয়ালদের দখলে। বাঁশবাগান থেকে বেরিয়ে এসে তারা নাকি সারামাঠ দাপিয়ে বেড়াত। গ্রামের বাড়ির পোষা কুকুর পেটো যখন ওদের দেখে পরিত্রাহি চিৎকার জুড়ে দিত, তখন তারা নাকি এক জায়গাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পেটোর দিকে এমনভাবে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তাকিয়ে  থাকত, যেন একবার সামনে পেলেই তার মাংস দিয়ে চাঁদনী রাতে বনভোজনের পর্বটা সেরে ফেলবে। পেটো তাই তাদের থেকে বেশ দূরত্ব বজায় রেখেই  কিছুক্ষণ অন্তর রাতে পাড়ায় টহল দেওয়া পাহারাদারদের মতো তার নিজের ভাষায় ‘জাগতে রহো’ বলে সবাইকে সতর্ক করে দিত।

 

বাড়িতে মুরগী পুষতো ছোটো পিসি। মুরগীর ডাক শুনলেই শেয়ালদের জিভ থেকে লালা ঝরত। মাঝেমধ্যেই আক্রমণ করত তারা। কাঠের ঘর ভেঙে মুরগী নিয়ে পালাত। একবার নাকি দাদুর গোয়ালে ঢুকে বাছুরের ঠ্যাঙ থেকে মাংস খুবলে নিয়ে গেছিল। বেশ উপদ্রবই করত তারা। সেসব শোনার পরেও তাদের চাক্ষুষ দেখার ইচ্ছে শিখি মন থেকে তাড়াতে পারেনি। শেয়ালেরা সবাই যে সারাক্ষণ মাঠে  হাজির থাকত, তা কিন্তু নয়। বোধহয় যখন গর্তের ভেতর বসে থাকতে থাকতে বিরক্তি বোধ করত, তখনই ফাঁকা মাঠের হাওয়া খেতে বেরিয়ে পড়ত তারা। তাছাড়া শিকার ধরার জন্য তো বেরতেই হতো। সারা গ্রামের এমন একটাও বাড়ি ছিল না, যেখানে তারা কোনো অনর্থ ঘটায়নি। অথচ দিনের বেলায় যারা বাঁশবনে ঢুকে শুকনো পাতা কুড়াত, শুকনো কঞ্চি ভাঙত জ্বালানির জন্য–তাদের ওপর কোনোদিন চড়াও হয়নি। তারা বোধহয় শেয়ালদের গর্তের আশেপাশে যেত না। 

 

যে গল্পটা শোনার পর শিখির শেয়ালদের বেশি করে দেখতে ইচ্ছে করে, শুনতে চায়, সেটা হলো–তাদের সন্ধের তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঠাকুমার শঙ্খধ্বনি শোনার পর একত্রে ডেকে ওঠা হুক্কা হুয়া রব। সে জানে সেটা কোনোদিন পূরণ হবার নয়। তবে কোথাও না কোথাও শেয়ালেরা আজও বেঁচে আছে সে ব্যাপারে শিখি নিশ্চিত। কারণ এখনও শেয়ালদের কোথাও কেউ লুপ্তপ্রায় প্রাণী বলে ঘোষণা করেনি। শিখিদের গ্রামের মাটির বাড়ি, নয়ানজুলি আর সেই মাঠটা আজও আছে। কেবল হারিয়ে গেছে বাঁশবন আর শেয়ালদের দল। এখন বাঁশবনটা পেয়ারার বাগান হয়ে উঠেছে।

 

ঠাকুমার মুখে বাঁশবনের রূপের বর্ণনা আর বাতাস মাখা বাঁশপাতার সুরেলা কনসার্টের সঙ্গে একসময় সেখানে দাঁতাল শুয়োর, সজারুদের থাকার কথা শুনে শিখির কল্পনাতে সেটা একটা ছোটোখাটো আমাজনের জঙ্গলের রূপ ধারণ করেছিল। প্রতিবার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া থেকে ফেরা পর্যন্ত গোটা মন জুড়ে থাকত বাঁশবন আর শেয়ালদের গল্প। চোখ বুজলেই শিখি যেন দেখতে পেত তাদের। বাঁশবন কেটে যারা পেয়ারার বাগান তৈরি করল, তারা কি শেয়ালদের পুনর্বাসন দেওয়ার কথা ভেবেছিল? নাকি শেয়ালেরা আগাম জানতে পেরে তাদের বাস উঠিয়ে অন্যত্র চলে গেছিল! তাদের যে কী হলো–সে খবর আর গ্রামের কেউ রাখেনি, সে যতই নিকট প্রতিবেশী হোক তারা। বোধহয় হাঁপ ছেড়ে বেঁচে ছিল তাদের গৃহপালিত পশুদের কথা ভেবে।

 

এবার স্কুলের গরমের ছুটির কয়েকটা দিন বাবা-মা ছাড়া একা-একাই গ্রামের বাড়িতে কাটিয়ে শহরের আবাসনে ফিরে মন্দারমণি যাওয়ার কথা শোনার পর শিখির কাছে শেয়ালদের কথা ভাবার সময় অনেকটাই কমে গেছিল। তার জায়গাতে ঢুকে পড়েছিল সমুদ্র আর ঝিনুক। এবার সে দীঘার থেকেও বেশি করে ঝিনুক কুড়বে, আর সেই ঝিনুক দিয়ে একটা বাড়ি বানাবে। তার মাঝেও ভেবে ফেলেছিল মন্দারমণির বিচে যদি কোনোভাবে জ্যান্ত শেয়ালের দেখা পেয়ে যায়, তাহলে এবারের ছুটি কাটানোর সময়টা শিখির কাছে সেরার সেরা হয়ে থাকবে। বিচে মাছ খাওয়ার জন্য তো বেড়াল, কুকুর, পাখিরা আসে। শেয়াল এলে ক্ষতি কী! তার মনের কথাটা একবার তার বাবাকে বলার ইচ্ছে হওয়ার পরেও বলল না। শুনে যদি হাসে, বলে সমুদ্রের বিচে গিয়েও সে শেয়াল দেখতে চায়!

 

এসব ভাবনাদের সঙ্গে নিয়ে একসময় তারা মন্দারমণি পৌঁছেও গেল। সমুদ্রে স্নান করা থেকে ঝিনুক কুড়নো সব ইচ্ছেই পূরণ হলো তার। কেবল জ্যান্ত শেয়ালের দেখা পেল না। এবার তাদের ফেরার পালা। সমুদ্রকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে গল্প জুড়ে দিলো তার প্রতিবেশী ভাই অর্কের সঙ্গে। দুটো পরিবার আলাদা আলাদা ফ্ল্যাটে থাকলেও একে অপরের খুব কাছের। শিখির বাবা আর অর্কর বাবা একই অফিসে চাকরি করে। তারা একসঙ্গেই সব জায়গায় বেড়াতে যায়। গাড়িতে কোথাও বেড়াতে গেলে দুজনে শেয়ার করে শিখিদের গাড়ি ড্রাইভ করে। কার কোনটা বেশি ভালো লেগেছে, সেসব নিয়ে জমে উঠল ফিরতি পথের  যাত্রা। সঙ্গে ঝিনুকের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে চলছিল কোন-কোনটা সবচেয়ে সুন্দর দেখতে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা। এত রঙ ওরা পায় কোথা থেকে? বোধহয় সমুদ্রই ঢেউভাঙার অবসরে তাদের সাজিয়ে তোলে। মিঠির বাবা ওদের গল্প শুনতে শুনতে ড্রাইভ করছিল। আর তার মা গল্প করছিল অর্কর মায়ের সঙ্গে।

 

তারা প্রায় কলকাতার কাছাকাছি চলে এসেছে।  কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে গেল ঘটনাটা। অনেকক্ষণ ধরেই গাড়িটা হর্ন দিচ্ছিল পেছন থেকে। হঠাৎই বেশ বিপজ্জনক ভাবেই ওভারটেক করল শিখিদের গাড়ির ডানদিক দিয়ে। আর ঠিক  তখনই একটা শেয়াল ছুটে রাস্তা পার হচ্ছিল। শিখিদের সামনে থাকা গাড়িটার গতি এতটাই বেশি ছিল যে শেয়ালটাকে এক ধাক্কায় মেরে দিয়ে চলে গেল! রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়ল তার শরীরটা। শিখির বাবা আর অর্কর বাবা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, “কী অসভ্য রে, এইভাবে শেয়ালটাকে মেরে দিয়ে চলে গেল! কীসের এত তাড়া রে ভাই, এরা মানুষ?”

শিখির কানে কথাগুলো পৌঁছতেই সে তার চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। দুটো হাতে কান চেপে ধরল । সে যেন কিছুই শুনতে পায়নি। কিছুতেই তাকাবে না মৃত শেয়ালটার দিকে। আর কোনোভাবেই সে তার জীবন থেকে একটা শেয়ালকেও হারাতে দিতে চায় না।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up