সাগর পাড়ে লাল কাঁকড়ার দেশে
লিপি চক্রবর্তী

ছোট্টো বন্ধুরা, তাজপুর, মন্দারমণি, দিঘা, শঙ্করপুর–এই নামগুলো শুনলেই মনে হয় যেন, কতবার গিয়েছি। আবার যাওয়া কেন বাপু! তাই না? কিন্তু এই অতি চেনা জায়গাগুলোর মধ্যেও যদি খুঁজে পাওয়া যায় লুকোনো কোনো মজাদার কিছু, তাহলে নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগে। বঙ্গোপসাগরের কুলে অবস্থিত মন্দারমণিতে পেয়েছিলাম তেমনই অভিনব লাল কাঁকড়ার দর্শন। তোমরা অনেকেই জানো, কলকাতা থেকে মন্দারমণি যেতে সময় লাগে খুব বেশি হলে ঘণ্টা চারেক। শহরের কোলাহল থেকে বেশ কিছুটা সরে এসে, মূল মন্দারমণি থেকে প্রায় দু' কিলোমিটার দূরে এক দুপুরে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ আশ্রমে। মন্দারমণির সমুদ্র সৈকতের এই অংশটিকেই বলা হয় লাল কাঁকড়া বিচ।

প্রসঙ্গত, আমরা থাকব এই রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ আশ্রমের অতিথিশালাতেই। কোনো চেঁচামেচি নেই। খুব সুন্দর আশ্রমিক পরিবেশ। কলকাতা থেকে গাড়িতে সড়ক পথ ধরে গিয়েছিলাম আমরা। চাউলখোলার মোড় থেকে বাঁ দিকে ঘুরে এগিয়ে চললাম। মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে অল্প এগোলেই, রাস্তার পাশেই পড়বে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ আশ্রম। আশ্রমের ভিতরে ঢুকেই মন ভালো হয়ে গেল। ঝকঝকে পরিষ্কার করে ঝাঁট দেওয়া চত্বর। ডানদিকে তারজালির বেড়া দেয়া রঙিন ফুলগাছের সারি। বাম দিকে স্কুলের গাড়ি, অতিথিদের আনা গাড়ির পার্কিংয়ের জায়গা। আর তার মধ্যেই বিভিন্ন রকমের জবা আর গোলাপ ফুলের গাছ।
খুব খিদে পেয়ে গেছিল। জিনিসপত্র সামনের বারান্দায় রেখে, কিঞ্চিৎ ফ্রেশ হয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় খেতে গেলাম আমরা। খেয়ে এসে জিনিসপত্র সহ ঘরে গেলাম। দোতলায় ঘর। বারান্দায় এসে দেখি, সামনেই বিশাল বড় একটা সবেদা গাছ আর একটা আমগাছ গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। আর দু'টো গাছেই অজস্র আম আর সবেদা ফলেছে। কী যে ভালো লাগছিল দেখতে! একটু বিশ্রাম নিয়ে পোশাক বদলে বিকেলে গেলাম সমুদ্রের কাছে। আশ্রম থেকে বেরিয়ে সামনের রাস্তাটা পেরিয়ে একটু এগোলেই সৈকত। এখন সমুদ্র বেশ শান্ত। জল নেমে সরে গিয়েছে অনেক দূরে। একটু আগে জল ছিল কাছাকাছি, তার প্রমাণ রয়েছে ভেজা বালিতে জলের রেখায়।

লাল কাঁকড়ার দল বিছিয়ে রয়েছে সৈকত জুড়ে। আমাদের পায়ের চাপে সামান্য যে কম্পন জেগেছে বালিতে, তাতেই তারা টুপ টুপ করে ঢুকে পড়ছে গর্তে। আর কয়েকটি কাঁকড়া বালিতে মুখ লুকোতে না পেরে দৌড়চ্ছে জলের দিকে। দৌড় প্রতিযোগিতায় তো আমরা হেরে ভূত। ওদের কাছে আর পৌঁছতেই পারছি না। ওদিকে দু'টি ছেলে ছোট টানা জাল নিয়ে পারের কাছে সামান্য জলেই জাল টানছে। ওদের পিছনে আমরাও জাল লক্ষ্য করে দ্রুত হাঁটছি। অনেকটা দূরে গিয়ে জাল টেনে বালির উপর তুলে আনল ওরা। জালে আটকে অনেক পার্শে মাছ তবে আকারে একটু ছোট। জ্যান্ত পার্শে দেখে এত মজা লাগছিল ! এইসময় কতগুলি মাছধরার নৌকা ফিরল জাল ভর্তি মাছ নিয়ে। সেও দেখার মতো ! প্রথমে জেলেরা নৌকাগুলি তীরে টেনে আনল। তারপর নৌকার ভিতর থেকে মাছগুলি বের করে, শেষে কাঁধের ভারায় মাছভর্তি জাল ঝুলিয়ে চলল তারা আড়তের দিকে।

ইতিমধ্যে সূর্যাস্ত হয়ে গিয়েছে, আকাশে কমলা রঙের আভা। আকাশ মেঘলা থাকায় সূর্যাস্ত দেখতে পাইনি আমরা। তখনও দিনের আলো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। এদিকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামল। নির্জন হয়ে পড়েছে সৈকত। দূরে দূরে একজন দু'জন মানুষের সিল্যুট। সাদা বালির উপর লাল রঙের অজস্র সচল বিন্দু। ওরা এই সৈকতের আদি বাসিন্দা, ওরা লাল কাঁকড়া। দুরন্ত কিন্তু ভারী ভীতু—মানুষের সাড়া পেলেই পালায়। ভেজা বালিতে খালি পায়ে খানিকটা হেঁটে, সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হতে ফিরে এলাম আশ্রমে।

তখন আরতি হচ্ছে শ্রীরামকৃষ্ণদেব, সারদা মা আর বিবেকানন্দের ছবির সামনে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের একটা বিশাল মূর্তি দাঁড়িয়ে পিছনে। আরতি শেষে প্রসাদ দিল ছোট ছোট ছেলেরা। ওরাই আরতি করছিল। আশ্রমের একজন বললেন, ছেলেরা আশ্রমের আবাসিক। এখানে থেকে লেখাপড়া করে। পরদিন সকালে দেখলাম, আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকেও ছাত্ররা আসে এই উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে। প্রাইমারি বিভাগে ছোট মেয়েরাও পড়ে। স্কুলের বাস বিভিন্ন জায়গা থেকে বাচ্চাদের নিয়ে আসে এবং ছুটি হলে পৌঁছে দেয়।
পরদিন খুব ভোরে সূর্যোদয় দেখব বলে ছুটলাম আবার সৈকতে। তখনও একটু অন্ধকার আছে। ধীরে ধীরে আকাশে অল্প আলো দেখা গেল। দূরে কালো কালো মাছধরার নৌকা রয়েছে বোঝা যাচ্ছে। তবে যাচ্ছে না আসছে বোঝা গেল না। তারপর লাল আভা ছড়িয়ে একটু একটু করে সূর্যদেব দেখা দিলেন। জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেখলাম আকাশের রং কেমন বদলে যাচ্ছে। সূর্যের তেজ বাড়লে, ফিরলাম আশ্রমের দিকে।

এতক্ষণ একটিও লাল কাঁকড়া চোখে পড়েনি। ফেরার পথে দেখি, সমস্ত সমুদ্র তট একেবারে লাল হয়ে আছে। একপা একপা করে যত এগোচ্ছি, ওমা, লাল আর নেই তো। এবার বুঝলাম, কাঁকড়ার দল গর্ত থেকে বেরিয়ে বসে আছে। আর আমাদের পায়ের আওয়াজে টুক করে ঢুকে পড়ছে তাদের গর্তের নিরাপদ আশ্রয়ে। এর মধ্যে দু'একটা আমাদের চলার পথে উঠে এসেছিল। একে তো দলছুট, তারমধ্যে একটা তো দেখি খুব লাজুক। বুঝতে পারছে না কোথায় লুকোবে। কয়েকজন ঢুকে পড়ল পাশের হালকা জঙ্গলের মধ্যে। একজন গাছের গুঁড়ির আড়ালে, একজন নামল ছোট্ট জলাশয়ে। ওদের খেলা আরো দেখতাম কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি তাড়া করল। অতএব আশ্রমে ফেরা।

বিকেলে টোটো ভাড়া করে গেলাম বাগুরান জলপাই সৈকত আর কপালকুণ্ডলা মন্দির। সঙ্গে উপড়ি পাওনা হলো রাস্তার পাশের ভেড়িতে চিংড়ি মাছ ধরা দেখা। কপালকুণ্ডলা মন্দির দেখে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা গল্প মিলিয়ে নেওয়া যায়। গাছগাছালির অন্ধকার ঘেরাটোপে শতাব্দী প্রাচীন মন্দির। নামেই মন্দির, কোনো বিগ্রহ নেই। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষ বলে চলেছেন কপালকুণ্ডলা আর নবকুমারের কাহিনি। এই পরিবেশের এমন মাহাত্ম্য যে স্বীকার করতে বাধা নেই, গা ছমছম করছিল।
বৃষ্টি আমাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে গিয়েছে। প্রকৃতির মধ্যে এভাবে ভিজতে খুব ভালো লাগছিল। এখানে বঙ্কিমচন্দ্রের মূর্তি রয়েছে। সেই মূর্তিকে ঘিরে প্রতি বছর মেলা বসে। বাগুরান জালপাই সৈকতে পৌঁছে দেখি সমুদ্র বহুদূরে, তার আভাসটুকু শুধু পাওয়া যাচ্ছে। সৈকত জুড়ে উঠে আসা সমুদ্রের জল অনেকটা জায়গা নিয়ে নদীর মতো আটকে গিয়েছে। আর লাল কাঁকড়ার দল সেই জল পারাপার করছে অবলীলায়। আকাশ কালো করে বৃষ্টি এলো চরাচর জুড়ে, এইসময়। এখানে একটা ছোট সংরক্ষিত জঙ্গল আছে। স্থানীয় মানুষরা বললেন, ভয় পাওয়ার মতো জীবজন্তু কিছু নেই।

ফিরে এলাম আশ্রমে। একটা ব্যাপার এখানে এসে উপলব্ধি করেছি যে, যদি এখানে কোনো সমুদ্র না থাকত, তাহলেও এই সুন্দর পরিবেশে নিরিবিলিতে কিছুসময় শান্তিতে ও আনন্দে কাটিয়ে দেওয়া যেত। দ্বিতীয় রাত্রির শেষে ফিরব আমরা। সকালে দেখি আকাশের মুখ বেশ ভার। সারারাত খুব বৃষ্টি হয়েছে। তাও গেলাম একবার সমুদ্রের কাছে। বেশ বড় বড় ঢেউ ভাঙছে এখন পারের কাছে। সাগর আর আমার মাঝে বৃষ্টিধারা যেন এক স্বচ্ছ কাচের চকচকে দেয়াল তৈরি করেছে। এই অনুভূতি লেখায় প্রকাশের নয়, শুধু অনুভব করার। আশ্রমের ভিতরে একটা ছোট পুকুর আছে, বর্জ্য জল ফেলার জন্য। সেখানে শুনি খুব হইচই। ইয়া বড় বড় সোনা ব্যাঙ বৃষ্টির জল পেয়ে প্রবল চেঁচামেচি জুড়েছে। আমি কোনোদিন সোনা ব্যাঙ দেখিনি। এই প্রথম সামনাসামনি দেখলাম। একটা কথা জানাই তোমাদের, ঝকঝকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এই সৈকতে কিন্তু স্নান করা যায় না।
রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ আশ্রমে খুব সামান্য অর্থের বিনিময়ে থাকা ও খাওয়া যায়। ব্যবস্থা বেশ ভালো। কিছু নিয়ম অবশ্য মানতে হয়, যেটা অসম্ভব কিছু নয়। আগে থেকে বুকিং করে যেতে হয়। হঠাৎ পৌঁছে গেলে থাকার জায়গা না মেলার সম্ভাবনাই বেশি। সমুদ্র সৈকতের লাল কাঁকড়া দর্শনের পাশাপাশি এখানে থাকার আনন্দও মনে রয়ে যাবে আজীবন। আশ্রম সম্পর্কে আরো তথ্য জানতে এই নাম্বারে ফোন করতে পারো—08116793234.

পাঠকদের মন্তব্য
250