ছোটোদের চাঁদের হাসি / হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা / ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পুরাণ ও ইতিহাস এই রাজ্যের শরীর জুড়ে

 

ছোট্ট বন্ধুরা, বলো তো, ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকে মোট ক’টি রাজ্য আছে ? ভারতের মানচিত্র একটু মনে করো, তাহলেই এক নিমেষে নামগুলো মাথায় চলে আসবে। ঠিকই বলেছ, মোট সাতটা রাজ্য ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকে। রাজ্যগুলি হলো আসাম, মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশ। উত্তর-পূর্বের এই সাতটি রাজ্যকেই একসঙ্গে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বলে অভিহিত করা হয়। এই ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর অন্যতম হলো ত্রিপুরা। আজ তোমাদের বলবো সেই ত্রিপুরার কাহিনি।    

                                                      

      আয়তনে ভারতের চতুর্থ ক্ষুদ্রতম রাজ্য ত্রিপুরা। মূলত ১৯টি উপজাতির বসবাস ত্রিপুরায়–যাঁদের মধ্যে ত্রিপুরী, রিয়াং, জামাতি, চাকমা, হলাম, লুসাই, মগ উপজাতি উল্লেখযোগ্য। জাতিগতভাবে এঁদের সামাজিক আচার, সংস্কৃতি, ভাষা বৈচিত্রপূর্ণ। মোটামুটি সকলেই নাচে-গানে উৎসবমুখর। ত্রিপুরার উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ এমনকী দক্ষিণ-পূর্ব সবদিকই ঘিরে রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ইতিহাস ও প্রকৃতি অতি সুন্দরভাবে সাজিয়ে তুলেছে ত্রিপুরাকে। পাহাড়, অরণ্য, দিঘি, প্রাচীন মন্দির দিয়ে ঘেরা এই রাজ্য। দেশ-বিদেশে ত্রিপুরার হাতের কাজের যথেষ্ট কদর রয়েছে। নানান বর্ণ ও ডিজাইনের শাড়ি, শীতলপাটি, বাঁশ ও বেতের রকমারি সম্ভার পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।    

  

    

ত্রিপুরার ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য–দুইই যথেষ্ট সমৃদ্ধ ! এই রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাসের উল্লেখ রয়েছে মহাভারতেও। পৌরাণিক রাজা চন্দ্রবংশীয় যযাতির পুত্র দ্রুহ্য কিরাত দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে নতুন রাজ্য গড়েন এই অঞ্চলে। আর দ্রুহ্যর ৪০তম উত্তরসূরি মহারাজ ত্রিপুরের নাম থেকে এই রাজ্যের নাম হয় ত্রিপুরা। সমস্ত ত্রিপুরা জুড়েই রয়েছে অসংখ্য দ্রষ্টব্য স্থান। সবগুলি দেখতে মোটামুটি ভাবে ছয়-সাত দিন সময় লাগে। তোমরা ত্রিপুরা বেড়াতে গেলে প্রত্যেকটি দ্রষ্টব্যই সময় করে দেখার চেষ্টা করো। সবগুলিরই ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ, মহারাজা বীর বিক্রম কলেজ, চতুর্দশ দেবতা মন্দির, সিপাহিজলা, উদয়পুর, ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির, কুঞ্জবন, নীরমহল, ডম্বুর ফলস, পিলাক, কসবা, ব্রহ্মাকুন্ড, তৃষ্ণা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি, দেবতামুরা, উনকোটি, জম্পুই পাহাড়।                                       

 

     

প্রথমেই বলব কুঞ্জবনের কথা। ত্রিপুরা রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য কুঞ্জবন। এর বর্ণময় অতীতের কথা জানলেই বিষয়টি বুঝতে পারবে তোমরা। অবসর বিনোদনের জন্য ১৯০৯ সালে মহারাজা রাধাকিশোর তৈরি করেন মালঞ্চ নিবাস। অতীতে সুড়ঙ্গ পথে উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের সঙ্গে মালঞ্চ নিবাসের যোগাযোগ ছিল। এখানেই আছে মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্যর নিজস্ব নকশায় অনুচ্চ টিলার উপরে গড়া অতীতের পুষ্পবন্ত প্রাসাদ তথা আজকের কুঞ্জবন। মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য হলেন সেই গোবিন্দ মাণিক্য, যাঁকে বা যাঁর পরিবারকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘বিসর্জন‘। অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার ও বলিপ্রথার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ এই নাটক।

 

       

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কয়েকবার ত্রিপুরার রাজপরিবারের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন, থেকেছেন মালঞ্চ নিবাসে। শেষবার ত্রিপুরা গিয়েছিলেন ১৯২৬ সালে, সেবার তিনি ছিলেন পুষ্পবন্ত প্রাসাদের এক মহলে। কুঞ্জবনের বাতাসে যেন আজও গুঞ্জরিত সেইসব কাহিনি। আগরতলা শহর থেকে ৫৩ কিমি দূরে রুদ্রসাগর লেকের দ্বীপে ভাসমান প্রাসাদ নীরমহল। মার্টিন এন্ড বার্ন কোম্পানি প্রায় নয় বছর ধরে গড়ে তুলেছিল এই মহল। হিন্দু ও মোগল স্থাপত্যের মিশ্রণে গড়ে তোলা এই ভাসমান প্রাসাদ মহারাজা বীর বিক্রমকিশোর মাণিক্য বাহাদুরের প্রমোদ ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর নামকরণ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভাসমান এই প্রাসাদটি সত্যিই নয়নাভিরাম। নীরমহল থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য মন ভরিয়ে দেবে।    

 

      

এবার আমি তোমাদের বলব উনকোটি আর জম্পুই পাহাড়ের গল্প। আগরতলা থেকে উনকোটির দূরত্ব ২১৪ কিলোমিটার। কোটি থেকে এক কম অর্থাৎ উনকোটি। ৪৫ মিটার উঁচু রঘুনন্দন পাহাড় কেটে খোদিত ও প্রোথিত হিন্দু তীর্থ উনকোটি। আগে এর নাম ছিল ছাম্বুল। শাল, সেগুন, দেবদারু আর অগুরুতে ছাওয়া বৌদ্ধ ও হিন্দু আমলের অরণ্যময় এই শৈবতীর্থে পুরো পাহাড়টাই ভাস্কর্যময়। শিব, হরগৌরি, সিংহবাহিনী দুর্গা, পঞ্চমুখী শিব, বিষ্ণুপদ, ভারতের বৃহত্তম ব্যাস রিলিফ ভাস্কর্য ৩০ ফুট মুখমণ্ডলের বিশালাকার কালভৈরব-বাসুদেব, রাম-লক্ষণ-হনুমান, গণপতি ছাড়াও আরো নানা দেবদেবী রয়েছেন সারা পাহাড় জুড়ে। ১২ মিটার উঁচু জটাজুটধারী শিব এখানে কালভৈরব নামে খ্যাত। ৩ মিটার দীর্ঘ শিবের জটাও নজর কাড়ে। শিবের বাহন তিনটি ষাঁড়ের মূর্তিও দেখার মতো।

 

       এছাড়া নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত নানা শিলামূর্তিও রয়েছে পাহাড় চূড়ায়। রয়েছে সুন্দরী ঝর্না, উষ্ণ প্রস্রবণ। প্রসঙ্গত, বসন্তে অশোক অষ্টমী তিথিতে মেলা বসে এখানে। কাছেই গহীন জঙ্গলে রয়েছে ৩ ফুট উঁচু চতুর্মুখী শিব। জনশ্রুতি, কৈলাশ থেকে কাশী যাওয়ার পথে পথশ্রমে ক্লান্ত দেবতাদের (সংখ্যায় এক কোটি) অনুরোধে সপার্ষদ শিব বিশ্রাম নেন এখানে। পরদিন যাত্রাকালে বাকি দেবতারা নিদ্রাচ্ছন্ন থাকায় শিব একাই কাশীর পথে যাত্রা করেন। শিব চলে যাওয়ার পর বাকি উন কোটি দেবতা দিবাকরের আবির্ভাবে পাষাণে রূপান্তরিত হন। এর প্রতিষ্ঠা নিয়ে অবশ্য দ্বিমত রয়েছে। কেউ বলেন, পালযুগের শৈবতীর্থ উনকোটি। আবার কারো কারো মতে সেন রাজাদের গড়া উনকোটির এই অমর ভাস্কর্য। প্রতিষ্ঠা ঘিরে ভিন্ন মত থাকলেও উনকোটির সৌন্দর্য কিন্তু তুলনাহীন । 

 

     

এবার জম্পুই পাহাড়ের কথা। আগরতলা থেকে ২৫০ কিমি দূরে ৩০০০ ফুট উঁচুতে চিরবসন্তের দেশ জম্পুই পাহাড়। ৬টি পাহাড়ের সমষ্টি জম্পুইতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী লুসাই উপজাতিরা বসবাস করে। পাশ্চাত্যের ভাবধারায় গড়ে উঠেছে এদের সমাজজীবন। সবুজে মোড়া জম্পুই রূপে মুগ্ধ করে পর্যটকদের। পাহাড়ী ঢালে গাছে গাছে ধরে থাকে কমলালেবু। থাকার জন্য রয়েছে একটিমাত্র সরকারি লজ, সেখান থেকে সূর্যোদয় দেখার স্মৃতি ভোলবার নয়। আর ভাংমুন হেলিপ্যাড থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুইই সমান মনোমুগ্ধকর।

 

       আগরতলা শহর থেকে ২৪ কিমি দূরে ১৮.৫৩ বর্গ কিমি জুড়ে রয়েছে ত্রিপুরার অন্যতম আকর্ষণ সিপাহিজলা। কথিত আছে কোনো এক সিপাহীকে জলাসমেত এই জমি উপহার দেন মহারাজা বীর বিক্রম মাণিক্য। তাই এর নাম সিপাহীজলা। সুন্দর আরণ্যক পরিবেশে রয়েছে অর্কিড গার্ডেন, কৃত্রিম লেক, ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি, জুলজিকাল ও বোটানিক্যাল গার্ডেন। তক্ষক, ভল্লুক, চশমাপড়া বানর, নীলগাই ছাড়াও আরো অনেক স্তন্যপায়ী জন্তুর দেখা মেলে। অসংখ্য পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে থাকে এখানকার আরণ্যক পরিবেশ। পরিযায়ী পাখিদের মেলাও বসে শীতকালে। পাশাপাশি নানা জাতের সাপেরও স্বর্গরাজ্য সিপাহিজলা। এছাড়াও এখানে রয়েছে মৃগ উদ্যান। চলার পথে দুপাশের রবার বাগিচা দেখে মুগ্ধ হতে হয়।

 

 

আগরতলা (ত্রিপুরা) যাওয়ার জন্য বিমান, ট্রেন ও বাস–এই তিনটি প্রধান উপায় আছে। যার মধ্যে বিমান দ্রুততম (কলকাতা/দিল্লি থেকে)। ট্রেন বা বাসে গেলে খরচ কম, কিন্তু, সময় অনেকটাই বেশি লাগে। থাকার জন্য রয়েছে প্রচুর হোটেল ও গেস্ট হাউস। তার মধ্যে মসজিদ রোড ও শকুন্তলা রোডে রয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হোটেল। সব ধরনের বাজেটের ভালো মানের হোটেল পাওয়া যায় এখানে। বিশেষত মসজিদ রোড উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের কাছাকাছি হওয়ায় এটি একটি সুবিধাজনক স্থান। এছাড়া চুপাইয়েও বেশ কিছু গেস্ট হাউস ও হোমস্টে গড়ে উঠেছে।

 


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up