ঘুম ভাঙতেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন
মৃণালিনী ঠাকুর

আজ সকালেই পৌঁছেছি কালিম্পং জেলার অন্তভূর্ক্ত পাহাড়ী গ্রাম চারকোলে। এখন সামনে গোধূলি আলোয় মায়াময় খোলা আকাশ। সেখানে দৃশ্যমান অস্তগামী সূর্য। পাহাড়ের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যের শেষ রশ্মিরেখা। ঠান্ডা বাতাস হু হু করে ঢুকে পড়ছে নাক-কান দিয়ে। বুঝতেই পারছিলাম, আর বেশিক্ষণ বাইরে বসে থাকা যাবে না। সোয়েটার-চাদর-টুপি-মোজায় শোভিত হয়েও কাঁপছি। কিন্তু ঘরে যেতে যে মন চায় না। কী অনির্বচনীয় এক মুহূর্ত ! আসন্ন সন্ধ্যা তার আঁচল দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে এই নির্জন পাহাড়ী গ্রাম। বাসায় ফেরা পাখির কূজনে দিবাশেষের কাব্যের সুর। ঘরে ফিরছে পোষা গরু-ছাগলের দল। তাদের ডাকাডাকির সুরও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে চরাচর জুড়ে।
এবারের ঠিকানা হোমস্টে স্নো হোয়াইট হলিডে ইন। তবে, চারকোলে আমি আগেও এসেছি। সেবারে ছিলাম মমতা গুরুংয়ের হোমস্টে-তে। মুগ্ধ হই মমতার আন্তরিক আতিথ্যে। চারকোল থেকে কিছুটা এগিয়ে পাবুং বলে একটা জায়গাতেও ছিলাম একবার। তার মালিক স্থানীয় তরুণ খড়্গ গুরুং। পাবুংয়ে ওঁদের পারিবারিক ফার্ম হাউস। সে আবার এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এবারের হোমস্টে-র কর্ণধার বিজয় গুরুং, পরিবারের সকলে মিলে অতিথিদের দেখভাল করেন। প্রসঙ্গত জানাই, চারকোল এমন এক দৃষ্টিনন্দন গ্রাম, যেখানে বারবার আসা যায়। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ ভিউ মেলে বেশ কয়েকটি স্পট থেকে। আর উত্তরবঙ্গের পাহাড় মানেই তো প্রতিবারই নতুন কিছু প্রাপ্তি!

একটু আগেই সূর্য পুরোপুরি ডুবে গেছে। চরাচর জুড়ে নেমেছে অন্ধকার। ঘরের সামনে খোলা চাতালে এসে দাঁড়াই। তারারা মিটিমিটি জ্বলছে। ঠাণ্ডা পড়েছে জাঁকিয়ে। আগেই লক্ষ্য করেছি, হোমস্টে-তে অতিথি হয়ে এসেছে একদল তরুণ। তরুণদের দলটি এবার বায়না তোলে, এত ঠান্ডা–একটু বন ফায়ার হবে না ? সত্যিই তাই। এমন ঠান্ডায় আগুনের সেঁক তো অবশ্যই চাই। হোমস্টের সংগ্রহে কাঠকুটো মজুতই থাকে ! ছেলেদের উৎসাহে বিজয়জি সেসব নিয়ে আসেন। তারপর আড্ডা, বন ফায়ার, ছেলেদের উল্লাস আর গান…জমে যায় শীতরাতের পাহাড়ী বাতাস।
সেই বাতাসেই ভেসে আসে রান্নার সুবাস। কিচেনে মুরগি তৈরি হচ্ছে ডিনারের জন্য। শুনলাম, খুঁজে-পেতে গ্রাম থেকে দেশি মুরগি যোগাড করে আনা হয়েছে, যার স্বাদ নাকি স্বর্গীয়। বিজয়জির স্ত্রীর রান্নার হাতটি চমৎকার। ডিনারে দুর্দান্ত রুটি-চিকেন খেয়ে যখন বিছানায় গেলাম, তখনও হাওয়ায় উড়ছে আগুনের ফুলকি। উড়ন্ত জোনাকিদের সঙ্গে দেখাদেখি, কানাকানি চলছে তাদের। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় জমে যেতে যেতে জানালার কাঁচ দিয়ে দেখি সেই অনির্বচনীয়তা।

ঘুম ভেঙ্গেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন ! অনেকটা বিস্তারে একেবারে স্বর্গীয় মেজাজে দৃশ্যমান তিনি এখানে। সচরাচর কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে আমার তেমন দেখাসাক্ষাৎ হয় না। চারকোল এসে ভাগ্য সুপ্রসন্ন ! সকলেই মুগ্ধ, অভিভূত। এই পর্ব শেষ হলো সূর্যদেব আবির্ভুত হওয়ার পর। সূর্য ওঠার পর আর দেখা যায় না তাকে। ততক্ষণে রোদ্দুর মাখা নীল আকাশ বিছিয়েছে সামিয়ানা। দূর পাহাড়ের স্তরে স্তরে লেখা রূপসী বর্ণমালা। আবহমানকাল দাঁড়িয়ে প্রাচীন গাছেরা। অতি চেনা হলুদ গাঁদাফুলের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে দুষ্টু রোদ্দুরকণা। ইতিউতি উড়ছে প্রজাপতির দল। এইসব দেখতে দেখতেই ব্রেকফাস্ট-এর ডাক পড়ে।
কাঞ্চনজঙ্ঘার কথা তো আগেই বলেছি। শুনলাম নাথুলা রেঞ্জও অনেকটা দেখা যায় এই হোমস্টে থেকে। তবে, সেটা দেখার জন্য একেবারে ভোরে উঠতে হবে। এবার আর হলো না সেটা। পরে কখনও…! কাছাকাছি রয়েছে গুরুং মনাস্ট্রি, দেবী মন্দির (গুহার ভিতরে) আর সংসারী মা। আশপাশের সকলেই খুব জাগ্রত বলে মনে করে এই দেবীকে। চারকোল থেকে সাইট সিয়িংয়ে যাওয়া যায় বেশ কয়েকটি জায়গায়। কালিম্পং খুব দূরে নয়। কালিম্পং শহরের দ্রষ্টব্যগুলি ছাড়াও, এখান থেকেই যেতে পারেন পেডং, রিশপ, লাভা, লোলেগাঁও, বারমিয়াক, রামধুরা, সিলেরি গাঁও, ইচ্ছে গাঁও ইত্যাদি জায়গা। সব ঘুরে দেখতে হলে কয়েকটা দিন থাকার পরিকল্পনা করে আসতে হবে।

লাঞ্চে ডিম কষা, স্কোয়াশের তরকারি, ডাল আর আলুভাজা খেয়েছি। সঙ্গে আচার তো আছেই। এবার একটু এই পাহাড়ী গ্রাম সম্পর্কে কিছু তথ্য। চারকোল বেশ বড় এলাকা। ছোট ছোট অঞ্চল ঘিরে লোকালয়। পেশা মূলত চাষবাস। প্রায় সব ধরনের শাকসবজি হয় এখানে। যেমন, স্কোয়াশ, বিন, সব ধরনের কপি, রাই শাক, ধনে পাতা ইত্যাদি। এছাড়া আদা, ভুট্টা খুব বেশি। ফুলঝাড়ু গাছের চাষও করেন অনেকেই। মৌমাছি চাষের জন্যও এখানকার আবহাওয়া বিশেষ উপযোগী। ছোট স্তরে গরু-ছাগল, মুরগির ডেয়ারি ও পোলট্রিও বেশ কিছু মানুষের জীবিকা। এখন হোমস্টে ব্যবসায় এসে গেছেন অনেকেই। ড্রাইভিং-এ আছেন কেউ কেউ। আর অনেকেই আর্মিতে যান। বলা ভালো, তরুণদের অধিকাংশ স্বপ্ন দেখেন সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার।
চারকোলে পানীয় জলের সংকট মারাত্মক। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাবস্থাও খুব অনুকূল নয়। তবে, এইসব কঠিনতা, সমস্যা নিয়েও ভালোই আছেন এখনকার মানুষ। আসলে ভালো থাকতে পারাটা পাহাড়ের মানুষের সহজাত। মিলেমিশে থাকেন সকলে। দুর্গাপূজা, দশেরা, দিওয়ালি, ভাইফোঁটা, লোসার, ক্রিসমাস একসঙ্গে উদযাপন করেন। গ্রামে মূলত হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষের বাস। আজও ঠান্ডা জাঁকিয়ে পড়েছে। ডিনারে খিচুড়ির সঙ্গে ঝুরি ঝুরি আলুভাজা, পাঁপড় আর ডিমের অমলেট। সঙ্গে পাহাড়ের গোল লঙ্কার আঁচার। এককথায় অমৃত। আজকের ডিনারের এই আয়োজন আমারই অনুরোধে।

পরের দিন ঘুম ভাঙতেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ি। গ্রামের মানুষ অপরিচয়ের গন্ডি মুছে আত্মীয়তার হাসি হাসে। এদিক-ওদিক চোখ ফেরালেই দেখি অপরূপা প্রকৃতি। সামনে বহুদূর পর্যন্ত খোলা আকাশ, দূরের পাহাড়শ্রেণী দেখতে দেখতে ব্রেকফাস্ট, এক স্মৃতিময় গাথাকাব্য হয়ে থাকবে। আজ ব্রেকফাস্টে খেয়েছি পরোটা আর আলুর সবজি। পাহাড়ী অঞ্চলের নিয়মমতোই উঁচুনিচু জমির ওপর পুরো বাড়িটা। স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামায় কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। আমার অনুরোধে কটেজের বারান্দায় ব্রেকফাস্ট সযত্নে পৌঁছে দিয়ে গেছে বিজয়জির ছেলে। নিতান্তই কিশোর। সঙ্গে তার পিসতুতো দাদা। দুজনেই অতি চটপটে ও কর্মঠ। ওদের যত্ন ও আন্তরিকতার সত্যিই কোনও তুলনা হয় না।
আজ সকালে ছেলের দল বিদায় নিয়েছে। তাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে দুপুরেই আর একটি দল এসে গেছে। স্কুল শিক্ষিকার এই টিম নিচের বড় ঘর দু’টিতে আছেন। কাছেই মাঘী পূর্ণিমা। চাঁদ ক্রমশ অহংকারী। আমার তত্ত্বাবধানে পাক্কা বাঙালি মুড়ি মাখা প্রস্তুত। সঙ্গে আদা দেওয়া লিকার চা। আড্ডায় সেইসব নিয়ে বসেছি। চরাচর শান্ত। সামান্য কোলাহল নিচের ঘর দু’টিতে। শীত পোশাকে সাজুগুজু করে বার-বি-কিউর মজা নিতে প্রস্তুত হচ্ছেন অতিথিরা। চারকোলের বিস্তৃত প্রকৃতি জ্যোৎস্নায় মাখামাখি। কাল সকালে ফেরার পালা। বিদায়ের বাঁশি বেজে উঠেছে চারকোলের আকাশে, বাতাসে। গোছগাছ, প্যাকিং চলছে।

এই অবকাশে আরও কিছু তথ্য জানাই। খাবার জন্য লাঞ্চ বা ডিনারে পাবেন ভাত-রুটি, ডাল-সবজি-ভাজি, চিকেন-ডিম, আচার-পাঁপড়-স্যালাড। ব্রেকফাস্টে টোস্ট-অমলেট, রুটি বা পুরি এবং সবজি/ভাজি। সন্ধ্যার স্ন্যাকসে পকোড়া পাবেন। বন ফায়ার ও বার-বি-কিউর বন্দোবস্ত আছে। চমৎকার খোলামেলা পরিবেশ। দল বেঁধে গেলে দারুন উপভোগ করবেন। আবার একান্তে কাটাতে চাইলেও অসুবিধা নেই। শীতে খুব বেশি ঠান্ডা পড়ে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে তাই যথেষ্ট শীতবস্ত্র সহ যাওয়া জরুরি। কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিস্কুট বা শুকনো খাবার সঙ্গে রাখলে ভালো। গিজার, রুম হিটার ও Wifi-এর সুবিধা আছে এখানে, এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রেক্ষিতে যা বিশেষ উল্লেখ্য।

থাকা খাওয়ার খরচ দিন-প্রতি জন-প্রতি ১২০০ টাকা। এনজেপি/ শিলিগুড়ি থেকে চারকোল রিজার্ভ গাড়িতে যেতে পারেন। এছাড়া শিলিগুড়ি মহানন্দা ব্রিজ/ এয়ার ভিউ মোড় থেকে শেয়ার গাড়ি ছাড়ে। ফেরার জন্য চারকোল থেকে এনজেপি শেয়ার গাড়িও যায় সকালে। এরই পাশাপাশি এনজেপি/ শিলিগুড়ি থেকে প্রায় সারাদিন শেয়ার গাড়ি কালিম্পং পর্যন্ত আসে। কালিম্পং থেকে চারকোল শেয়ার গাড়ি আসে রোজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। হোমস্টে কর্তৃপক্ষকে আগাম জানালে শেয়ার গাড়িতে আসা-যাওয়ার ব্যাবস্থা করে দেন ওঁরা। ওঁদের ফোন নম্বরে (94744 43635) যোগাযোগ করে সব তথ্যই আগাম জেনে নিতে পারেন।

পাঠকদের মন্তব্য
250