ছোটোদের চাঁদের হাসি / হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা / নভেম্বর ২০২৬

কাঞ্চনজঙ্ঘার অপার সৌন্দর্য ও ইতিহাসের গন্ধমাখা দার্জিলিং

 

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের মধ্যে অনেকেই এরমধ্যে দার্জিলিং দেখে ফেলেছ জানি। কেউ কেউ হয়তো কয়েকবারই ঘুরে এসেছ। মজার কথা হলো, বিশ্বখ্যাত দার্জিলিং, যা কিনা আমাদের ঘরের কাছেই, সেখানে যাওয়াটা কিন্তু আমার ক্ষেত্রে অনেক বয়সে পৌছে ঘটেছিল। সে হোক, এবার তোমাদের সেই প্রথমবারের দার্জিলিং দর্শনের অভিজ্ঞতার গল্পই বলব। পরে আরও কয়েকবার গেলেও, পাহাড়ের রানি দার্জিলিংকে প্রথম দেখার রোমাঞ্চ ছিল সত্যিই আলাদা। একেবারে গোড়ার দিকে আমার যে ভয়টা ছিল, সেটা হলো–দার্জিলিং, দিঘা আর পুরী বাঙালির কাছে পুরোনো হয় না। সুযোগ পেলেই তাঁরা এই তিনটি জায়গায় বেড়াতে যান! অর্থাৎ প্রচুর জনসমাগমের ভয়। গিয়ে যেটা হলো, ভিড় পেলাম প্রত্যাশিত মাত্রাতেই। তবে, রোমাঞ্চকর প্রাপ্তিও কিছু কম ছিল না !!

 

 

নভেম্বরের এক হিমসকালে ফুরফুরে মেজাজে আমরা কয়েকজন যাত্রা শুরু করলাম। গাড়ি শিলিগুড়ি শহর ছাড়িয়ে সুখনা জঙ্গলে পৌঁছতেই বদলে গেল দুপাশের দৃশ্যপট। ঘন জঙ্গল, আকাশছোঁয়া গাছপালার ফাঁকফোকড় দিয়ে রোদ্দুর উঁকি মারছে। পাখির কিচিরমিচির, ঝিঁঝির ডাক শুনতে শুনতে জঙ্গল পার হলাম। রোহিনী হয়ে গেলে পথ সংক্ষেপ হয়। কিন্তু সেটা হলো না। বিশেষ কারণে সেই পথের মুখে নো এন্ট্রি, পুলিশের কয়েকজন আধিকারিকও দাঁড়িয়ে। অতএব পথ বদল। পুরোনো পাঙ্খাবাড়ি হয়েই যাওয়া। এই যাত্রায় অসংখ্য হেয়ার পিন বেন্ড, আর শুধুই চড়াই। একপাশে উঁচু উঁচু রুক্ষ পাহাড়ের প্রাচীর, অন্যদিকে গভীর খাদ। পথের পাশে ছোট ছোট গ্রাম। একটি-দুটি দোকান। নির্জন পথ ধরে কখনও একা পথচারী, কোথাও দল বেঁধে কাজে যাচ্ছেন হাসিখুশি মহিলার দল। এদিক-ওদিক খেলছে কুচোকাঁচারা, একটু বড়রা স্কুলের পথে। পাহাড়ী জনজীবনের এইসব নিখুঁত ছবি দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই কার্শিয়াং।

 

 

এখানে পৌঁছে হঠাৎ করেই যেন ছন্দপতন। ঘিঞ্জি রাস্তা, গাড়ির হর্ন, দোকানবাজারে ঠাসা এক শহর। শহর পার হয়ে আবার নির্জন পথ। নানা বাঁক ঘুরে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। সূর্যের উত্তাপ সামান্য টের পাওয়া যায়। সঙ্গে উত্তুরে হাওয়ার কাঁপন। মনটা 'চা চা' করছে সকলেরই। গাড়ি থামে পথের ধারের ছোট্ট দোকানের সামনে। দুই নেপালি মহিলা দোকানটি চালান। তাঁদেরই একজন চা বানালেন। চায়ের কাপ মুখে তুলেছি, হঠাৎই চোখ আটকে গেল পথের বাঁ দিকে। রবিন ব্লু আকাশে শুচিশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। যেন রীতিমতো ঘোষণা, 'আমায় দেখো'! অনেকটা দূর ছড়ানো সেই রেঞ্জ দেখে মন পাগলপারা। ফটাফট ছবি, সেলফি তুলে গাড়িতে উঠি আমরা। আবার যাত্রা শুরু।

 

 

শিলিগুড়ি থেকেই গাড়িপথের পাশে পাশে দৃশ্যমান দার্জিলিংয়ের মুখ্য আকর্ষণ, পৃথিবী বিখ্যাত টয়ট্রেনের লাইন। তোমরা যারা দার্জিলিংয়ে এসেছ, তারা নিশ্চয়ই টয়ট্রেন চড়েছ! আর খুব মজাও পেয়েছ নিশ্চয়ই। জানো তো, এই রেলপথের পোশাকি নাম হলো দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে। সাপের মতো আঁকাবাঁকা ও সরু লাইন, যার শেষ দার্জিলিংয়ে। কার্শিয়াং থেকেই এই রেললাইন অবশ্য অধিক চোখে পড়ে আমাদের। যেতে যেতে ট্রেনও দেখতে পেলাম, তাতে সপরিবারে হাসিখুশি মুখের ট্যুরিস্ট। মাঝে ছোট ছোট কয়েকটি স্টেশন। শুধু জয় রাইড নয়, কাজেকম্মেও স্থানীয় মানুষ যাতায়াত করছে দেখলাম। সেই যাত্রায় আমার অবশ্য টয় ট্রেন চড়া হয়নি। আগাম টিকেট বুকিং না করে আজকাল টয় ট্রেনে জায়গা পাওয়া যায় না। সেবারে তাই স্টেশনগুলো দেখেই সাধ মেটাই।

 

আমাদের গাড়ি এবার দাঁড়ালো ঘুম স্টেশনের সামনে। এমনিতে ঝাঁ চকচকে স্টেশন। তবে, হেরিটেজ লুকটা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এখানকার মিউজিয়ামটিও চমৎকার। যাওয়ার পথে টয়ট্রেন ছাড়াও বরাবর সঙ্গে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। বার বার দেখেও মেটে না আশ। এই পথেই অনুভব করি, দার্জিলিংয়ের একটা অদ্ভুৎ ম্যাজিক আছে, সেটা কাছে গেলেই টের পাওয়া যায়। পথ যেমন যেমন ওপরে উঠেছে, বাঁক ঘুরেছে, তেমন তেমন রূপের অতীত অরূপ রসের বন্যা বইয়ে দিয়ে আকাশে উদ্ভাসিত হয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

 

 

আমাদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট হোটেলটি রাজভবনের পিছনে। রাজভবনের সামনের জায়গাটা অনেকটা ছড়ানো মালভূমির মতো, যা থাকে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। অতএব গাড়ি ছেড়ে কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হলো আমাদের। হোটেলে নির্দিষ্ট ঘরটিতে ঢুকেই দারুণ চমক। দেওয়াল জোড়া বিশাল কাঁচের জানালা। পর্দা সরাতেই আকাশ জুড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা। বলা বাহুল্য, পরের তিনটে দিন যখনই আমরা ঘরে, যতক্ষণ দিনের আলো, ততক্ষণ দৃশ্যমান তিনি। কি যে অপূর্ব রূপ তার, কি অমোঘ আকর্ষণ ! কেন সবাই পাগলের মতো বার বার ছুটে আসে দার্জিলিং, সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না।

 

লাঞ্চ করে চললাম ম্যালের দিকে। রাজভবনের সীমানা পার হয়ে বাঁদিকে হোটেল। সামনের পথ গিয়েছে মল রোড-স্থিত সেই বিখ্যাত বাজারের দিকে, যা লোকমুখে ম্যাল বলেই পরিচিত। পৌঁছলেই চোখে পড়ে সারি সারি শীতপোশাকের দোকান। বেশির ভাগ দোকানীই মহিলা। পরিপাটি সেজে দক্ষ হাতে ব্যবসা সামলাচ্ছেন তাঁরা। ট্যুরিস্ট সিজন। ব্যস্ততা তুঙ্গে তাই। কিছুক্ষণ বসে ম্যালে বিচরণরত মানুষজন দেখলাম। সূর্য ততক্ষণে অস্তরাগের লাজুক আলো ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশের কোণে কোণে। সেই আলোর পরশ নিয়েই হোটেলে ফিরলাম আমরা।

 

 

এরপরের দিনগুলিতে একটু একটু করে দার্জিলিংকে আবিষ্কার করলাম। গির্জা আর গুম্ফা, পুরোনো বাড়িঘর, পুরো শহরটার পাশ দিয়ে কু ঝিক ঝিক ক’রে চলে যাওয়া টয় ট্রেন, ঘুমন্ত ঘুম স্টেশন, দুর্দান্ত বাতাসিয়া লুপ–সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পুরোনো ইতিহাসের অপরূপ সুগন্ধ দার্জিলিংয়ের শরীর জুড়ে। এবার টাইগার হিল দর্শন প্রসঙ্গ। নাঃ, চূড়ান্ত মুডি কাঞ্চনজঙ্ঘা এদিন সূর্যোদয়ের মহা মুহূর্তে দর্শন দেননি আমাদের। শুনলাম, অনেকে একাধিকবার এসেও বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গেছেন।

 

তবে, আমার এই প্রভাতের প্রাপ্তি অন্যত্র। সূর্য ওঠা না দেখলেও অস্তগামী চাঁদ দেখেছি। শেষরাতের সেই চাঁদের কী যে মায়াময় রূপ ! শুধু মুগ্ধ হওয়া নয়, প্রকৃতির দুষ্টু খেলাও উপভোগ করলাম। চাঁদ যেন এদিন প্রতিজ্ঞা করে বসেছিল ডুববে না বলে। চাঁদও ডোবে না, সূর্যও ওঠে না। নিচে আকাশ পানে হাহুতাশ চেয়ে আমরা। এই প্রভাতে পূব আকাশে আরও একজন বহুক্ষণ হাজির ছিলেন, জ্বলজ্বল করা শুকতারা, সেও তো প্রকৃতিরই দান। এই সব নিয়েই অমলিন থাকবে এই প্রভাতের স্মৃতি।

 

 

পরের দিনটা দার্জিলিং শহরেই ঘোরাঘুরি। এখানে কয়েকটি নাম উল্লেখ করবো–পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক, পিস প্যাগোডা, তেনজিং নোরগে রক, জাপানিজ বুদ্ধিস্ট টেম্পল, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট এন্ড এভারেস্ট মিউজিয়াম, হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট, ঘুম মনাস্ট্রি, চুন্নু সামার ফলস এন্ড রক গার্ডেন, সানচেল লেক, সিংরিলা ন্যাশনাল পার্ক, অবজারভেটরি হিলস, দার্জিলিং-রঙ্গিত ভ্যালি প্যাসেঞ্জার রোপওয়ে। নামগুলো কমবেশি সকলেরই জানা। যেটা বলার, খুব ভালো করে এই কেন্দ্রগুলি দেখার জন্য কমপক্ষে সাত দিন জরুরি। তোমরা এলে এই দ্রষ্টব্যগুলি অবশ্যই দেখো। সময়াভাবে আমাদের পক্ষে অবশ্য সবগুলি দেখা সম্ভব হয়নি। তারই মধ্যে লেবঙ টি এস্টেট দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বিশাল উপত্যকা জুড়ে চা বাগান, সবুজের প্রাণময় উৎসব সেখানে। আর ঠিক উপরেই দিগন্তবিস্তৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা। অসাধারণ লাগল ঘুম মনাস্ট্রি আর পিস প্যাগোডাও।

 

এই সুযোগে তোমাদের জানাই, দার্জিলিং শহর গড়ে উঠেছে পাহাড়ের ধাপে ধাপে। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এ শহর ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অনেকটাই ছড়িয়েছে আয়তনে। আকাশছোঁয়া বিল্ডিংগুলি অপরিসর রাস্তাকে ক্রমশ যেন অধিকার করছে। পাহাড়ী মানুষরা জন্মগত অভ্যাসেই পরিচ্ছন্ন, পরিশ্রমী ও সৌন্দর্যপ্রিয়। প্রত্যেকের ঘরের সামনে ফুলের বাগান বাধ্যতামূলক। ঘুম থেকে উঠেই বাড়িঘর পরিষ্কারে নেমে পড়ে ওরা। তবে, শহরের রাস্তা পরিষ্কার রাখা তো আর কোনো এলাকার মানুষের দায় নয়। তাছাড়া, সারা বছর প্রচুর পর্যটক আসেন এখানে। অপরূপ এই শৈলশহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা সবাইকেই করতে হবে।

 

 

পরের দিন মিরিক যাত্রা। আর এই পথ এতটাই অপরূপ যে শুধু এই যাত্রাপথ নিয়েই একটা পুরো উপন্যাস লিখে ফেলা যায়। পাইনের ছায়া এক অদ্ভুৎ মায়ায় মুড়ে দিয়েছে পুরো পথ। শুধু পাইন নয়, অন্যান্য গাছও রয়েছে। তারা আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে যুগযুগান্ত। চোখ জুড়নো সবুজ, আর তাও নানা শেডের। পথে পড়ল প্রথমে লেপচা জগৎ, ছোট্ট সুন্দর এই স্পট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ দুরন্ত। মন বলে কোথাও যাবো না, চোখ ভরে শুধু দেখে যাই। এরপর সীমানা, এটা নেপালের সীমান্ত। খুব কাছে পশুপতি মার্কেট। ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা সবাই স্তব্ধ। এমন সৌন্দর্যের কাছে নতজানু হতেই হয়। দাঁড়িয়ে আছি নেপালের অংশে। সেখান থেকে ডান দিকে তাকালে যতদূর চোখ যায় শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা। ঝকঝকে নীল আকাশে তার অমোঘ অস্তিত্ব জানান দিয়ে সে যেন বলছে, 'আমার কাছে এসো। আমার কাছে আসতেই হবে'। মিরিক থেকে ফেরার পথে অন্য রূপ তার। গোধূলীর রঙে লালাভ আকাশ, আর সোনালি আভায় অভিষিক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা।

 

মিরিকের পথে এ ছাড়াও দেখলাম গোপালধারা টি এস্টেট। স্বপ্নের জালবোনা এক সবুজ গালিচা পাতা রয়েছে উপত্যকা জুড়ে। দেখে দেখে আশ মেটে না। মিরিকে গিয়ে লাঞ্চ আর লেক দর্শন। দার্জিলিং ফিরতে সন্ধ্যা। এরপর ব্যাগপত্র গোছানোর পালা। পরদিন সকালে দ্রুত তৈরি হচ্ছি, গাড়ি চলে আসবে। তারই মধ্যে জানালার বাইরে চোখ চলে যায়। আজ কি একটু বিষন্ন কাঞ্চনজঙ্ঘা ? মনে মনে আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোটেল ছাড়ি। তারপর পুরো রাস্তা ধরেই বার বার দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে। চলার পথের যাবতীয় অনুষঙ্গে মিশে সে যথার্থই বলে, এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো !!

 


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up