ছোটোদের চাঁদের হাসি / জেনে নিতে মানা নেই / সেপ্টেম্বর ২০২৬

শতবর্ষে মহানায়ক

 

মহানায়ক উত্তমকুমার (অরুনকুমার চট্টোপাধ্যায়) বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার আহিরিটোলায় জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের নাম চপলা দেবী, বাবার নাম চুনিলাল চট্টোপাধ্যায়। সিনেমা জগতে আসার আগে তিনি কলকাতা পোর্ট  ট্রাস্ট-এ চাকরি করতেন।

 

       তাঁর প্রথম ছবি ‘দৃষ্টিদান’ (১৯৪৮)। এরপরে আটটি ছবি পরপর ফ্লপ হওয়ার কারণে তাঁর কপালে ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ তকমা জুটেছিল। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির সাফল্যের মাধ্যমে তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। সন্ধ্যা রানী, অনুভা গুপ্ত, সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, সুপ্রিয়া দেবী, অঞ্জনা ভৌমিক, মাধবী মুখার্জি, সন্ধ্যা রায়, সুমিত্রা মুখার্জি, তনুজা, অপর্ণা সেন এবং আরও অনেক নায়িকার  সঙ্গে অসংখ্য ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। তবে,‘অগ্নিপরীক্ষা’ তাঁকে দারুণ খ্যাতি এনে দেয়, জন্ম হয় এক নতুন জুটির–উত্তম-সুচিত্রা। বাকিটা তো ইতিহাস। এরপর এই জুটিকে নিয়ে পরিচালকরা আরও অনেক ছবি নির্মাণ করেন–যার মধ্যে ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হলো দেরী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

 

     

  বড়দের পাশাপাশি বেশ কিছু ছবিতে গানের দৃশ্যে শিশুরাও মহানায়কের সহশিল্পী ছিল—‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘অবাক পৃথিবী’ (গান : এক যে ছিল দুষ্টু ছেলে), ‘জয় জয়ন্তী’, ‘হার মানা হার’ (গান : এসেছি আলাদিন),  চিরদিনের (গান : লাল নীল সবুজের মেলা বসেছে), ‘সোনার খাঁচা’ (গান : যারে যা উড়ে রাজার কুমার) ইত্যাদি।

 

      পরিণত বয়সে রোমান্টিক ইমেজের বাইরে গিয়ে নিজেকে ভেঙে একটু অন্য ধরনের, এমনকী নেগেটিভ চরিত্রেও  অভিনয় করেছেন মহানায়ক। ‘শেষ অংক’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘কলঙ্কিত নায়ক’, ‘বাঘবন্দী খেলা’, ‘ভোলাময়রা’ যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায় পরিচালিত দুটি ছবি ‘নায়ক’, (১৯৬৬) ও ‘ চিড়িয়াখানা’ (১৯৬৭)–য় তিনি যথাক্রমে সফল অভিনেতা অরিন্দম মুখার্জি ও সত্যসন্ধানী ব্যোমকেশ বক্সির চরিত্রে অভিনয় করেন।

 

        উত্তমকুমার বেশ কয়েকটি হিন্দি ছবিতেও কাজ করেছেন—ছোটি সি মুলাকাত, কিতাব, আনন্দ আশ্রম (দ্বিভাষিক), অমানুষ (দ্বিভাষিক), দূরিয়াঁ, দেশপ্রেমী ইত্যাদি। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ এবং ‘শুধু একটি বছর’ ছবি দুটি তিনি পরিচালনা করেছেন এবং ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ ছবিতে পীযূষ বসুর সাথে সহপরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।

 

       

গানে লিপ মেলানোর ক্ষেত্রে উত্তমকুমারের ক্ষমতা ছিল এতটাই ইউনিক, যেন মনে হতো পর্দায় উনি নিজেই গানটা গাইছেন। মান্না দে, শ্যামল মিত্র, কিশোর কুমার এবং আরো বহু নামী শিল্পী তাঁর জন্য প্লেব্যাক করেছেন। তবে উত্তম-হেমন্ত জুটি ছিল সেরা। দুজনের কন্ঠস্বরে ছিল আশ্চর্য রকমের মিল। এই কারণেই ‘শাপমোচন’, ‘দেয়া নেয়া’,  ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘জয়-জয়ন্তী’ প্রভৃতি ছবির গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। মহানায়ক নিজেও খুব ভাল গান গাইতেন। ‘নবজন্ম’ ছবিতে একটি গান উনি নিজেই গেয়েছিলেন। এছাড়াও ‘কাল তুমি আলেয়া’ ও ‘সব্যসাচী’ ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেছিলেন।

 

     অসাধারণ অভিনয়ের জন্য নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মহানায়ক। BFJA award পেয়েছেন ৮ বার—‘হ্রদ’ (১৯৫৫), ‘সপ্তপদী’ (১৯৬২), ‘নায়ক’ (১৯৬৭), গৃহদাহ (১৯৬৮), ‘চৌরঙ্গী’ (১৯৬৯), ‘এখানে পিঞ্জর’  (১৯৭২), ‘স্ত্রী’ (১৯৭৩) এবং ‘অমানুষ’ (১৯৭৫) ছবির জন্য। এছাড়াও ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে সেরা অভিনেতা হিসেবে Silver Lotus Award পেয়েছেন। কমল মিত্র, পাহাড়ি স্যান্যাল, ছবি বিশ্বাস, ছায়া দেবী, জহর রায়, ভানু ব্যানার্জি, অনুপ কুমার, সৌমিত্র চ্যাটার্জী, বিশ্বজিৎ, রঞ্জিত মল্লিক প্রমুখ অভিনেতারা বহু ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন।

 

      ১৯৪৮ এ গৌরী দেবীর সাথে তাঁর বিবাহ হয়।  ছোটভাই তরুণকুমারও একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা ছিলেন। ১৯৮০ সালের ২৪শে জুলাই ‘ওগো বধূ সুন্দরী’  ছবির শুটিং চলাকালীন উনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মাত্র ৫৩ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ‘নায়ক’ ফিল্মে তাঁর একটি সংলাপ ছিল “I will go to the top, the top, the top….”  নিজের অভিনয় গুণে তিনি সত্যিই এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, যার ধারেকাছেও কেউ কখনও পৌঁছতে পারেননি। তাই তো তিনি আজও একমাত্র ম্যাটিনি আইডল উত্তম কুমার—আমাদের সবার প্রিয় ‘মহানায়ক’।

 

◾ছবি ঋণ ইন্টারনেট

 


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up